‘দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চোখ দেখানোর জন্য অপেক্ষা করছি, কিন্তু এখনও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার নাম ডাকেনি। খুবই কষ্ট হচ্ছে, ক্লান্ত হয়ে পড়েছি,’— এভাবেই নিজের ভোগান্তির কথা এশিয়া পোস্টকে বলছিলেন প্রায় ৭০ বছর বয়সি আবু জাহিদ। তিনি রাজধানীর ফার্মগেটে ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে এসব কথা বলেন।
আবু জাহিদ জানান, তিনি তার এক ছেলেকে নিয়ে এক দিন আগে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন এবং যাত্রাবাড়ীর জুরাইন এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন। ভোরে হাসপাতালে এসে টোকেন নিয়েছেন, কিন্তু রোগীর ভিড় এত বেশি যে কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবেন, তা অনিশ্চিত।
শুধু আবু জাহিদের ক্ষেত্রেই নয়, ভোর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত চোখের রোগীর একই অবস্থা। অনেকে জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা এখানে নিত্যদিনের চিত্র।
দিনাজপুর থেকে আসা ৬৫ বছর বয়সি রোগী শাহিদুর রহমান বলেন, ‘চিকিৎসক বা স্টাফদের কাছে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়—এটা বহুবারের অভিজ্ঞতা। তবুও ভালো চিকিৎসার আশায় এখানে আসি, কারণ এর বিকল্প পাইনি।’
বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেশির ভাগ রোগীই তাদের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তবে তারা বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা নেই; মূল সমস্যা রোগীর অতিরিক্ত চাপ। স্থানীয় হাসপাতালে চোখের রোগের যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তারা রাজধানীমুখী হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটের কারণে দেশে অন্ধত্বের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ কোনো না কোনো চোখের সমস্যায় ভুগছেন। অথচ উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই।
দেশে চক্ষু বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও এত কম যে, সব রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা প্রতিরোধযোগ্য হলেও জনবলের ঘাটতির কারণে তা বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অপটোমেট্রিস্টের অভাবে লাখ লাখ মানুষ সময়মতো সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সাধারণ রিফ্র্যাকটিভ ত্রুটি থেকে শুরু করে ছানি, গ্লুকোমা ও ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির মতো জটিল রোগ দেরিতে শনাক্ত হচ্ছে, যা অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. এম মুজাহেরুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে প্রয়োজনীয় চক্ষু বিশেষজ্ঞের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এতে অন্ধত্বের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্যান্য দেশ যেখানে দৃষ্টিসংক্রান্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞও রাখার ব্যবস্থা করতে পারেনি।’
তিনি সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রয়োজনীয় জনবলের সঠিক হিসাব নিরূপণ ও দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ অপটোমেট্রিস্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সিনিয়র অপটোমেট্রিস্ট সৈয়দ মোহাম্মদ দিদারুল আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অপটোমেট্রিস্টরা চোখের প্রাথমিক সেবার সামনের সারির জনবল। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও গ্রামাঞ্চলে নিয়োগ দিলে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য অন্তত একজন অপটোমেট্রিস্ট প্রয়োজন।’
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত অপটোমেট্রিস্টের সংখ্যা মাত্র ২০০ জন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে অপটোমেট্রিস্টরা স্বতন্ত্রভাবে চেম্বার পরিচালনা করেন, প্রাথমিক থেকে জটিল চোখের সেবা দেন, লো ভিশন ব্যবস্থাপনা করেন এবং প্রয়োজন হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার্ড করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রতি দুই লাখ চোখের বিপরীতে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। তারা চোখের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করেন। তবে তাদের অধিকাংশই রাজধানী ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক।
অপটোমেট্রিস্টরা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, চশমা ও কনট্যাক্ট লেন্স প্রদান, শিশু ও স্কুলভিত্তিক স্ক্রিনিং, ছানি-গ্লুকোমা-ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল প্রদান করেন। বর্তমানে দেশে তাদের সংখ্যা মাত্র ২০০।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের বিপরীতে চারজন অপটোমেট্রিস্ট থাকা উচিত। সে হিসেবে দেশে অন্তত ৪ হাজার ৮০০ অপটোমেট্রিস্ট প্রয়োজন।
বর্তমানে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানে অপটোমেট্রি কোর্স চালু রয়েছে— চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথ্যালমোলজি (চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত) এবং ইত্তেহাদ কলেজ অব হেলথ সায়েন্স ও পিএসআই কলেজ অব হেলথ সায়েন্স (রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত)। এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতায় ভুগছেন, যার মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ক্ষেত্রে তা প্রতিরোধ বা চিকিৎসাযোগ্য। সংস্থাটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় চোখের স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
২০২১-২২ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ০.৬৯ শতাংশ মানুষ অন্ধত্বে ভুগছেন; পূর্বে এ হার ছিল ১.৪৫ শতাংশ। একইভাবে ৩ শতাংশ মানুষ লো ভিশনে আক্রান্ত। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা এখনও বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জনবলের ঘাটতি দূর না করলে দেশের চোখের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও নাজুক হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক চোখের সেবায় অপটোমেট্রিস্টদের সবচেয়ে কার্যকর জনবল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে পেশাগত মানোন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও স্বতন্ত্র পেশাগত পরিচয় নিশ্চিত করতে পৃথক কাউন্সিল গঠন জরুরি।
ফ্যাশন অপটিক্স লিমিটেডের সিনিয়র অপটোমেট্রিস্ট আবির দে বলেন, গ্রামাঞ্চলে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, সরকারি ক্যাডার না থাকা এবং দুর্বল নিবন্ধন ব্যবস্থার কারণে এ পেশা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণে ‘চোখের চিকিৎসা মানেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ’—এ ধারণা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে প্রাথমিক চোখের সেবায় অপটোমেট্রিস্টদের ভূমিকা উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন, যেখানে চক্ষু বিশেষজ্ঞের সংকট প্রকট। এ প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি পরীক্ষা, চশমা প্রদান, স্কুল স্ক্রিনিং ও জটিল রোগ শনাক্ত করে রেফার্ড করার ক্ষেত্রে অপটোমেট্রিস্টরাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। তিনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের চাকরির শ্রেণিবিন্যাসের দাবি জানান।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা অপটোমেট্রিস্টদের অপরিহার্য চোখের সেবাদানকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অপটোমেট্রিস্ট নিয়োগ, কমিউনিটি ক্লিনিকে অপটোমেট্রি কর্নার চালু এবং স্কুলভিত্তিক চোখের স্ক্রিনিং সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চোখের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে অপটোমেট্রিস্টদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব বাড়তেই থাকবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদ্যসাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. খায়র আহমেদ চৌধুরী বলেন, চোখের স্বাস্থ্যসেবায় জনবলের ঘাটতি চিহ্নিত করে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন অপটোমেট্রি কোর্স চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক।
তিনি বলেন, অপটোমেট্রিস্টদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি জরুরি। অন্যান্য দেশে তারা চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করেন। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিপুলসংখ্যক রোগীর ভোগান্তি কমবে।




