বিদেশে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের কাছ থেকে অন্তত ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সম্প্রতি উধাও হয়ে গেছে রিক্রুটিং এজেন্সি পরিচয় ব্যবহার করা ‘আর কনসাল্টেন্সি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। একেকজনের কাছ থেকে এক লাখ থেকে শুরু করে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। গড়ে আট লাখ করে হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ কোটি টাকা। রাশিয়া, ইউক্রেন, কসোভো, আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কাজের ভিসার নাম করে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
শুধু টাকা নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি আর কনসাল্টেন্সি অ্যান্ড এয়ার ওয়েভ প্রাইভেট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি। বিদেশে চাকরির নামে টাকা নিয়ে উল্টো সাতজনকে জাল ভ্রমণ ভিসায় ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠিয়েছে তারা। সেখানে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিতে বলা হয়।
আর কনসাল্টেন্সির ট্রেড লাইসেন্স মূলত একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) থেকে এই লাইসেন্স নিয়েছে তারা। প্রধান কার্যালয় ছিল উত্তরার ইউনিয়ন নাহার বিল্ডিংয়ে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক জয়পুরহাটের ধলাহারের মো. হাফিজুর রহমান। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. খালেদ হাসান জিতু। হাফিজুর রহমানের ছেলে ‘মাদকসম্রাট’ চয়েজ রহমানও ব্যবসায়িক অংশীদার। কোনো রিক্রুটিং লাইসেন্স ছাড়াই তারা এয়ার অ্যান্ড ওয়েভ প্রাইভেট লিমিটেডের আরএল নম্বর (১৫৯৬) ব্যবহার করে অবৈধভাবে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর কাজ করেছে।
মুখে বিদেশে চাকরির কথা বলা হলেও বাস্তবে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে সহজ-সরল মানুষকে। যশোরের তেলিধান্নাপাড়ার টিপু সুলতান, মানিকগঞ্জের শিবালয়ের রাকিবুল ইসলাম, ভোলার চরফ্যাশনের মো. খোকন, সিলেটের মোহাম্মদ আনার, নারায়ণগঞ্জের অপু হাসান, সাভারের নাইমুর রহমান ও জামালপুরের ফয়সাল মিয়া। ইউরোপে কাজের স্বপ্ন দেখানো হয় এই সাতজনকে। টিপু সুলতান প্রথমে কসোভোতে শ্রমিক ভিসায় যাওয়ার কথা ছিল। তবে শেষমুহূর্তে রাশিয়ার একটি চকলেট কোম্পানিতে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে আরও ছয়জনের সঙ্গে পাঠানো হয় জাল ট্যুরিস্ট ভিসায়।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল সাতজন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মস্কোর ডোমোডেডোভো বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। মস্কোর বিমানবন্দরে তাদের গ্রহণ করেন রুশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেখানে তারা পরিচিত হন দেব চক্রবর্তী নামে ভারতীয় বংশোদ্ভূত রুশ বাহিনীর এক এজেন্টের সঙ্গে।
দেব চক্রবর্তী প্রথমে তাদের জানান, তাদের বলা হয় চকলেট কোম্পানিতে কাজ করতে হবে। পরে জানানো হয় যে তাদের ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে হবে। তারা গোলাবারুদ এগিয়ে দেবে। আহতদের সহায়তা করবে।
দেব চক্রবর্তী তাদের জানায়, আর কনসাল্টেন্সির সঙ্গে যুদ্ধ করার চুক্তি অনুযায়ী তাদের রাশিয়া পাঠানো হয়েছে। তবে তখনও রিক্রুটিং এজেন্সি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে জানায়, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে পাঠানো হবে না। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে এ সময় নাইমুর রহমান ও ফয়সাল মিয়া সেন্ট পিটার্সবার্গের হোটেল থেকে পালিয়ে যায়।
অন্যদের সপ্তাহখানেক সেখানে রেখে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলানো হয়। এটিএম কার্ড দেওয়া হয়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় রণক্ষেত্র খারকিভের কাছাকাছি একটি ট্রেন স্টেশনে। দুই থেকে তিন ঘণ্টা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গাড়িতে করে গন্তব্য একটি পরিত্যক্ত ফার্ম। সেখানে সেনাবাহিনী তাদের মেডিকেল পরীক্ষা করে। পরে মেডিকেল রিপোর্ট বাংলায় অনুবাদ করে তারা জানতে পারেন, সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য তাদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ভুক্তভোগী টিপু সুলতান বলেন, তখন আমাদের আর বোঝার বাকি থাকে না যে আমাদের সেনাবাহিনীতে যোগদান করানো হচ্ছে। এর দুই-তিন দিন পর দেব চক্রবর্তী আমাদেরকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে যাওয়ার সময় আবার একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। অনুবাদ করে দেখি, লেখা আছে আমরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যাচ্ছি। সেখানে রুশ এজেন্ট ও সেনাবাহিনী আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত রুশ এজেন্ট আমাদের কাছে ৭-৮ লাখ টাকা দাবি করে। দেশীয় এজেন্সি সেনাবাহিনীর সঙ্গে ২-৩ মাস যুদ্ধ করার পরামর্শ দেয়। একপর্যায়ে আমরা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাইলে শুধু আমাদের পাসপোর্ট ফেরত দেয়।’
গত বছরের ১৭ এপ্রিল তারা রুশ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পালিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে মস্কোর একটি ট্রেন স্টেশনে কয়েক রাত কাটায় তারা। এরপর দেশীয় এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা মস্কোর মার্কেটে চলাচলের জন্য একটি কার্ড করে দেয়। কিন্তু এরই মধ্যে টিপু সুলতানকে তিনবার পুলিশ আটক করে নির্যাতন করে। পুলিশের নির্যাতনে খোকনের হাত ভেঙে যায়। এভাবেই প্রায় এক বছর ধরে মস্কোর স্টেশন ও রাস্তায় দিন কাটছে তাদের।
টিপু সুলতান বলেন, ‘আমাদের আগে আর কনসাল্টেন্সি আরেকটি গ্রুপকে রাশিয়া পাঠায়। যুদ্ধক্ষেত্রে আছে এ রকম ১৫-২০ জনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। তারা এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে আছে। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ১৫-২০ জনকে যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ-ছয়জন ফেরত এসেছে। রণাঙ্গনে অনেকে মারা গেছেন। যারা জীবিত আছেন তারাও দেশে ফিরতে চান। কিন্তু রাশিয়ার সেনাবাহিনী পাসপোর্ট আটকে রাখায় তারা বের হতে পারছেন না।’
টিপু সুলতানের স্ত্রী তৃপ্তী খাতুন বলেন, ‘স্বামীকে রাশিয়া পাঠানোর আগে কয়েকবার আর পরে একবার এজেন্সিতে গিয়েছিলাম। তারা বারবার বলেছিল, কোম্পানির চাকরিতে পাঠাবে। যুদ্ধক্ষেত্রে না। কিন্তু আমার স্বামীকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে। একটু ভালো থাকার জন্য বাবার কাছ থেকে দুই লাখ আর সুদের ওপর পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে এজেন্সিকে দেই। অথচ তারা এখন আমাদের ফোন ধরে না। শ্বশুরবাড়িতে ভিটেমাটি ছাড়া কিছু নেই। অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়ি আর সন্তান নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে।’
বরগুনার আদালতে মামলা
বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি প্রতারণার মামলা করেন মাসুম বিল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। তার অভিযোগ, রাশিয়ার চকলেট কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ব্যাংকের মাধ্যমে এজেন্সি ছয় লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়েছে।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমাদের গ্রুপে ছিল মোট ৩২ জন। এর মধ্যে সাতজন ২ এপ্রিল ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে মস্কোর ডোমোডেডোভো বিমানবন্দরের উদ্দেশে পাড়ি জমান। চুক্তি অনুযায়ী তাদের শ্রমিক ভিসায় না পাঠিয়ে ভ্রমণ ভিসায় পাঠানো হয়। চকলেট কোম্পানিতে কাজ দেওয়ার বদলে রুশ সেনাবাহিনীর দালালের হাতে তুলে দেওয়া হয়। আমরা চারজন ফ্লাইটের দুই দিন আগে বুঝতে পেরে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করব না বলে আর কনসাল্টেন্সির কাছ থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত নেই। তখন এজেন্সি শর্ত দেয়, বাকিদের যেন এই তথ্য জানানো না হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এজেন্সি এই চারজনকে অন্য কোনো দেশে পাঠায়নি, টাকাও ফেরত দেয়নি।’
তার অভিযোগ, এজেন্সি প্রথমে জমা দেওয়া সাত লাখ টাকার মধ্যে রাশিয়া না গেলে তিন লাখ টাকা কেটে রেখে বাকি চার লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তাও ফেরত দেয়নি। পরে আরেকটি গ্রুপে ৪৫ জনকে রাশিয়া পাঠানোর কথা থাকলেও তারাও শেষ পর্যন্ত যায়নি।
জমি, গহনা বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা
শিবচরের শিক্ষার্থী রাকিব মোল্লা বলেন, ‘আর কনসাল্টেন্সির ঘটনায় আমরা ২০০-এরও বেশি মানুষ বিপদে আছি। জমি বিক্রি করে সবাই নিঃস্ব। আমার বাবা-মা নেই। বোনের বাসায় থাকি। জমি ও বোনের গহনা বিক্রি করে ১১ লাখ টাকা দিয়েছি। আমাদের সঙ্গে ৫২ জনের কসোভোর জাল ভিসা দেখিয়ে ১১ লাখ করে এবং আলবেনিয়ার ১১০ জনের জাল ভিসা দেখিয়ে ১৫ লাখ করে টাকা নিয়েছে। কিন্তু কাউকে বিদেশে পাঠায়নি। আরসির সিইও জিতু উল্টো আমাকে মামলা দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি দিয়েছে। আমরা ৭২ জন মিলে উত্তরা পশ্চিম থানায় অভিযোগ করেছি। আমি এক নম্বর বাদী। কিন্তু এতদিনেও অভিযোগ মামলায় রূপান্তর হয়নি।’
নরসিংদীর মনোহরদীর মোহাম্মদ সোহাইল রহমান জমি বিক্রি করে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চেকের মাধ্যমে এজেন্সিকে ১১ লাখ টাকা দিয়েছেন। কথা ছিল কসোভেতে উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়া হবে। তবে শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।
সোহাইল রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মনোহরদীর আবু বক্কর, ফয়সাল মিয়া, গাজীপুরের পিন্টু মিয়াসহ ১৫ জনের একটি গ্রুপের কসোভো যাওয়ার কথা ছিল। প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে নিয়েছে এজেন্সি। পরে কাউকেই পাঠানো হয়নি। গত জানুয়ারিতে ১০০ জনের বেশি ভুক্তভোগী উত্তরা পশ্চিম থানায় অভিযোগ দিয়েছি। র্যাব-১ কার্যালয়ে ১০ জন মিলে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো ফয়সালা হয়নি। আসামি গ্রেপ্তার হয়নি, টাকাও ফেরত পাইনি।’
আরেক ভুক্তভোগী টাঙ্গাইল সদরের বাসিন্দা আলামিন হোসাইন। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘২০২৪ সালে এজেন্সির মাধ্যমে আমাদের কসোভো যাওয়ার কথা ছিল। আমার সঙ্গে টাঙ্গাইলের আরেকজন ছিল। সে সময় তারা বলেছিল সাড়ে সাত লাখ টাকায় বৈধভাবে কসোভো যাওয়া যাবে। পরে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করি। গত বছরের আগস্টে তারা ছয় মাসের ভিসা দেয়, যার মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে আমাদের কাছে তারা ১১ লাখ টাকা বুঝে নিয়েছে। কিন্তু এরপর থেকেই কোম্পানির অফিস বন্ধ।
মাদারীপুর শিবচরের আরেকজন কাওছার হোসেন বলেন, ‘আমরা আলবেনিয়ার ১১০ জনের গ্রুপে ছিলাম। সেখানে ১০ জন করে ১১টি গ্রুপকে পাঠানোর কথা ছিল। তবে প্রথম গ্রুপটি দুবাইয়ে গিয়ে ইন্দোনেশিার জাল পাসপোর্টে ধরা পড়লে বাকিদের আর পাঠানো হয়নি। আমার সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি ছিল। ধারদেনা করে সাত লাখ টাকা দিয়েছি।’
গাজীপুরের জয়দেবপুরের দীপঙ্কর রায় বলেন, ‘সাড়ে সাত লাখ টাকা নিয়েছে আরসি এজেন্সি। এখন অফিস নিয়ে ভাগছে। কষ্টের টাকা তুলে দেওয়ার পর তারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’
দুবাইয়ে কারাভোগ
আলবেনিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন ছিল ইব্রাহিম মিয়া, সিফাতুজ্জামান লতিফ, রাজিব মন্ডল, রাসেদ ভূঁইয়া ও আব্দুল্লাহ্ আল মামুন। পাকিস্তান হয়ে আলবেনিয়া পরে ইতালি। গত ১৬ জুলাই তারা শাহজালাল বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। তবে দুবাই বিমানবন্দরে এজেন্সির কথামতো ইন্দোনেশিয়ার জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে ট্রানজিট সম্পন্ন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তারা। এরপর সঙ্গে থাকা ডলার ও অন্যান্য নথিপত্র জব্দ করে দুই দিন ডিটেনশন সেন্টারে রেখে চারজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। তবে আব্দুল্লাহ্ মামুনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত বছরের ১৮ জুলাই ভুক্তভোগীরা বিমানবন্দর থানায় পাসপোর্ট জালিয়াতি করে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করেন। এতে আর কনসাল্টেন্সির সিইও মো. খালেদ হাসান জিতু এবং তার দুই সহযোগী রাশেদ ও খালেদকে আসামি করা হয়।
লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, ‘আর কনসালটেন্সি’-এর রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স না থাকলেও তারা এয়ার অ্যান্ড ওয়েভের আরএল নম্বর (১৫৯৬) ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দিন আর কনসালটেন্সির উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১৯, ইউনিয়ন নাহার বিল্ডিংয়ের ১০তলা ঠিকানায় গিয়ে তাদের অফিস তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। দুই হাজার বর্গফুটের এই অফিসের ফ্ল্যাটের মালিক নতুন ভাড়াটিয়ার জন্য ভবনের সামনে ব্যানার সাঁটিয়েছেন। ভবনের কেয়ারটেকার আলতাফ হোসেন বলেন, আরও চারমাস আগ থেকেই এই অফিসটি তালাবদ্ধ। এমনকি ইউনিয়ন নাহার বিল্ডিংয়ের বিপরীতে পাশে তাদের আরেকটি অফিস সেটিও তালাবদ্ধ দেখা যায়। এ সময় তাদের কর্মচারিরা নতুন অফিসের ঠিকানা উত্তরা সেক্টর ১১ এর ২০ নম্বর সড়কের ৮৪ নম্বর প্লটের কথা জানান। পরে সে ঠিকানায় গিয়েও এই অফিসের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হাফিজুর রহমান, খালেদ হাসান জিতুর মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেও তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি।
এ বিষয়ে এয়ার অ্যান্ড ওয়েভ প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে এম শফিকুল ইসলাম (পিএসসি) এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘২০২২-২৩ সালের দিকে এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করি। তবে মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমতি নিয়ে চুক্তি করা হয়নি। তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল বিদেশ থেকে যে ডিমান্ড লেটার আসবে সেটি এবং এর বিপরীতে যাদের পাঠানো হবে তাদের তালিকা আমাদের দিতে।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে তারা কথা রাখলেও পরবর্তীতে সেটি রাখিনি। এরমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে নানান ধরনের অভিযোগ আসতে শুরু করলে ২০২৪ সালের শেষের দিকে আমরা তিন দফা চিঠি দিয়ে আমাদের আর এল নাম্বার তাদের ব্যবহার করতে নিষেধ করি। ২০২৫ সালের নভেম্বরের দিকে আলবেনিয়া থেকে ফেরত আসা একটি গ্রুপ মামলা করলে তখন আমরা তাদের বিরুদ্ধে জিডি করি।’
এদিকে, এয়ার অ্যান্ড ওয়েভ প্রাইভেটলিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই দাবি করলেও বিভিন্ন সময়ে আর কনসালটেন্সি’-এর প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে শ্রমিক ভিসায় প্রবাসে যাওয়া ইচ্ছুকদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রোগ্রামে দেখা গেছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধ লাইসেন্স না থাকলে কোনোভাবেই কোনো কোম্পানি বিদেশে শ্রমিক পাঠানো এবং এ সংক্রান্ত লেনদেন করতে পারবে না। যদি তারা এটি করে থাকে তবে সেটি মানবপাচারের মধ্যে পড়ে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করলেও সরকারকে জানিয়ে ঘোষণা দিয়ে নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ায় করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ জনগণের সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার নাম করে প্রতারণা করলে ভুক্তভোগীদের সরকার ও আইনের আশ্রয় নিতে হবে। সরকারকে এসব বিষয় কঠোরভাবে দমন করতে হবে। জনগণকেও সচেতন হতে হবে। কোথায় যাচ্ছে, কার মাধ্যমে যাচ্ছে সব কিছু খোঁজ নিতে হবে।’
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, ‘আমাদের দেশের লোকজন বেশি আয়ের আশায় ইউরোপের উন্নত দেশে পাড়ি জমায়। এদের কেউ শিক্ষা ভিসায় যায়, অন্যরা যায় শ্রমিক ভিসায়। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অনেক সময় প্রতারণা করে। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত সচেতনতামূলক প্রচার চালানো। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনসহ লিফলেট দিয়ে প্রচার করা। কিন্তু সরকার তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে না। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি টাস্কফোর্স আছে। এই টাস্কফোর্সের সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো। আগে এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে নিয়মিত বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস, বিমানবন্দরে অভিযান চালানো হতো। এখন তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।’
তিনি বলেন, ‘রাশিয়ায় যুদ্ধ চলছে কয়েক বছর ধরে। সেখানে প্রতারিত হয়ে কয়েকজন বাংলাদেশি মারাও গেছে। অনেকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভিডিও পাঠিয়েছে। প্রতারক চক্রের সঙ্গে মাত্র কয়েকটি এজেন্সি জড়িত। সরকার চাইলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এক্ষেত্রে ইমিগ্রেশনেও সরকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশে যেখানে যুদ্ধ চলে সেখানে আপাতত কেউ গেলে যাচাই-বাছাই করতে পারে। ভ্রমণ ভিসায় গেলে সেটিও যাচাই করতে পারে। অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ (যুদ্ধরত দেশে পাঠানো) রাখতে পারে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার শাহরিয়ার আলী বলেন, ‘রাশিয়ায় পাঠানো ভুক্তভোগীদের স্বজনরা থানায় যোগাযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্য ঘটনার বিষয়ে জানা নেই। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানানো যাবে।’




