যতই দিন যাচ্ছে ততই সামরিক ও প্রযুক্তি খাতে চীন নিজেকে শক্তিশালী করে তুলছে। রান্নার কাজের জিনিস থেকে শুরু করে মহাকাশে স্যাটেলাইটের দাপট, কী নেই তাদের দখলে! শত্রুপক্ষকে কাবু করতে যুদ্ধবিমান থেকে যুদ্ধজাহাজ, সব ক্ষেত্রেই অনন্য হয়ে উঠছে এশিয়ার এ দেশটি। এবার বিশ্বকে তাজ্জব করে অত্যাধুনিক এক প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাল বেইজিং।
পারমাণবিক অস্ত্রকে এতদিন শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হলেও, আধুনিক বিশ্বে তথ্যই হলো বড় শক্তি। আর এই তথ্য বা তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে যদি হাতের মুঠোয় থাকে, তাহলে পরমাণু অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তাও অনেকটা গৌণ হয়ে পড়ে। সম্প্রতি তেমনই এক প্রযুক্তির পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। অর্থাৎ হাজার হাজার মিটার গভীর সমুদ্রে থাকা সাবমেরিন কেবলের মতো ডুবো কাঠামো কেটে ফেলতে সক্ষম এই প্রযুক্তি।
দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘হাইয়াং দিঝি ২’ গবেষণা জাহাজ চলতি বছরের প্রথম গভীর সমুদ্র বৈজ্ঞানিক অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এই ‘ইলেক্ট্রো-হাইড্রোস্ট্যাটিক অ্যাকচুয়েটর’ (ইএইচএ) অভিযানে ৩ হাজার ৫০০ মিটার (১১ হাজার ৪৮৩ ফুট) গভীরতায় সমুদ্রের তলদেশের কেবল কাটা যাবে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, ইএইচএ হাইড্রলিক্স বৈদ্যুতিক মোটর ও কন্ট্রোল ইউনিটকে একক ডিভাইসে একত্রিত করে ব্যবহার করে। জানা গেছে, ডিভাইসটিকে গভীর সমুদ্রের চাপ প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এটি কম গভীরতায় ‘সুনির্দিষ্ট যান্ত্রিক কাজ’ করতে সক্ষম। প্রযুক্তিটি আগেও সমুদ্রের তলদেশের কেবল কাটা ও গভীর সমুদ্রের গ্র্যাব পরিচালার জন্য সুনাম কুড়িয়েছিল।
পাইপলাইন মেরামত ও নির্মাণ কাজেও এটি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সময় বিবেচনায় এর সামরিক এবং অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে।
২০২২ সালে একটি অফশোর পাইপলাইন মেরামতের কাজে, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপের ১৮ ইঞ্চি অংশে ‘শুধুমাত্র একটি কাট দিতেই’ কর্মীদের পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। এর ঠিক এক বছর পরেই দূর থেকে পরিচালিত চীনা জাহাজগুলো ২ হাজার ফুট গভীরতায় ৩৮ ইঞ্চি ব্যাস পর্যন্ত পাইপ কাটতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে একটি মেরামতের কাজে মাত্র ২০ মিনিটে ৮ ইঞ্চি পাইপ কেটে ফেলা হয়েছিল।

সর্বশেষ পরীক্ষা এই সক্ষমতাকে অন্তত ৩ হাজার ৫০০ মিটার অর্থাৎ ১১ হাজার ৫০০ ফুট পর্যন্ত প্রসারিত করেছে।
চীনের এই প্রযুক্তির সফল পরীক্ষার এমন সময় এলো, যখন ভূ-রাজনৈতিক কূটকৌশলের একটি নতুন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সমুদ্র। আর এর তলদেশের অবকাঠামোও সম্ভাব্য আঘাতের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে উদ্বেগ বেড়েছে। এই ক্যাবলগুলো সমুদ্র তলদেশ দিয়ে তথ্য সরবরাহ করে এবং বিস্তৃত ফাইবার-অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশকে সংযুক্ত করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রের তলদেশের কেবলগুলো বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে রাশিয়াকে অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করা হয়। মস্কো নেটওয়ার্কগুলো পর্যবেক্ষণ করছে ও আন্তঃআটলান্টিক ডেটা কেবলের ওপর ঘোরাঘুরি করছে।
চলতি মাসের শুরুতে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলের অবকাঠামোর কাছে তিনটি রুশ সাবমেরিনের গতিবিধি শনাক্ত করেছে। গত বছর লোহিত সাগরে একাধিক সমুদ্রের তলদেশের কেবল কেটে ফেলা হয়েছিল এবং বাল্টিক সাগরে ক্যাবল ছিন্ন করার চেষ্টায় একটি রুশ শ্যাডো ফ্লিট ট্যাংকার তার নোঙর সমুদ্রের তলদেশ বরাবর ৫৬ মাইল পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে।




