২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চ মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের এ মাসে বাঙালি জাতি স্বাধিকার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠীর শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা, বৈষম্য, অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়ে বাংলাদেশের মানুষ যার কাছে যা আছে, তা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। নারী-পুরুষ সবাই দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অগণিত মানুষের জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা অর্জন করে লাল-সবুজের পতাকা। বাংলাদেশের মানুষ বুক উঁচু করে দাঁড়ায় পৃথিবীর মঞ্চে।
পরাধীনতার দেয়াল ভেঙে, দাসত্বের ঘর বিচূর্ণ করে স্বাধীনতা অর্জন করা ইসলামের মৌলিক চেতনা। শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ইসলামের আদর্শ। ইসলাম কখনো পরাধীনতাকে আশ্রয় দেয়নি। ইসলাম মানুষকে স্বাধীন রাখতে চায়।
মানুষ বিভিন্ন দেশ ও জাতি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত থাকবে—এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। ফলে মানুষের থাকবে ভাষার বৈচিত্র্য, সংস্কৃতির ভিন্নতা, রুচির পার্থক্য ও চেহারার অমিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে, যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (আল্লাহকে ভয়কারী)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
ভাঙো পরাধীনতার দেয়াল
ইসলামে সব মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। এখানে ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব-অনারবের কোনো পার্থক্য নেই। স্বাধীন মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে না। মানুষ যদি পরাধীন হয়, তাহলে তাদের মধ্যে পার্থক্যের দেয়াল গড়ে ওঠে। পরাধীন মানুষকে স্বাধীন মানুষ দাসের চোখে দেখে। এ জন্য হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে পৃথিবীর সব মানুষকে স্বাধীন মানুষ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। চূর্ণ করে দিয়েছেন পরাধীনতার শিকল। তিনি বলেছেন, ‘কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ (সহিহ বুখারি)
অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ (সা.) নবী হওয়ার আগেও সোচ্চার ছিলেন। সেসময় মানুষের কল্যাণে গড়ে তোলেন সামাজিক সংগঠন ‘হিলফুল ফুজুল’। বেলাল (রা.)-কে দাসত্বের কবল থেকে মুক্ত করে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। খাব্বাব ইবনে আরাশ (রা.), আম্মার বিন ইয়াসিরসহ এমন অনেক দাসকে তিনি স্বাধীন জীবন লাভে সহায়তা করেন।
দেশ রক্ষার সংগ্রামে মহানবী (সা.)
পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে মক্কার কুরাইশ, মদিনার ইহুদি, বেদুইন ও পৌত্তলিকরা সম্মিলিতভাবে মদিনার মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করতে ছুটে আসে। ইতিহাসে এটি খন্দকের যুদ্ধ নামে পরিচিত। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা। এ যুদ্ধে কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। মুসলমানদের ৩ হাজার। মদিনার মানুষের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা দানা বাঁধে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন। সালমান (রা.)-এর পরামর্শে মদিনার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মদিনার চতুর্দিকে পরিখা খনন করা হয়। একটি ঘোড়া লাফ দিয়ে যতটুকু যেতে পারে, তার চেয়ে বেশি দূরত্বে গর্ত খনন করা হয়। শুরু হলো পরিখা খনন। ১০ জন করে একটি দল করা হয়। প্রতিটি দল দৈর্ঘ্য ১০ হাত, প্রস্তে ১০ হাত, গভীরতায় ১০ হাত পরিখা খনন করে। ছয় দিনে পরিখা খনন শেষ হয়। পরিখা খননকালে একটি বড় ও শক্ত পাথর সামনে পড়ে, যা ভাঙা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিষয়টি জানানো হলে তিনি এসে আঘাত করলে তা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় হয়। পরাধীনতার শিকরে বন্দি হওয়া থেকে রক্ষা পায় মদিনা। মদিনাকে পরাধীনতা থেকে এভাবেই স্বাধীন করেন মহানবী (সা.)। খন্দক যুদ্ধ ছাড়াও মহানবী মুসলমানদের স্বাধীনতা রক্ষায় বিভিন্ন সংগ্রাম করেছেন।
মহানবীর দেশ প্রেম
মহানবী (সা.) মাতৃভূমি মক্কাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। কাফেরদের কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে তিনি যখন মক্কা ছাড়ছিলেন, বারবার পেছনে ফিরে মক্কাকে দেখছিলেন। মক্কা ছেড়ে যাওয়ার তীব্র কষ্ট বুকে নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ভূখণ্ড হিসেবে তুমি কতই না উত্তম, আমার কাছে তুমি কতই না প্রিয়। যদি আমার স্বজাতি আমাকে বের করে না দিত, তবে কিছুতেই আমি অন্য জায়গায় বসবাস করতাম না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৯২৬)
এ আবেগময় বেদনাকাতর অভিব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আরেক হাদিসে আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি খায়বার অভিযানে খাদেম হিসেবে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে গেলাম। অভিযান শেষে তিনি যখন ফিরে এলেন, উহুদ পাহাড় তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বলেন, ‘এই পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও একে ভালোবাসি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৮৯)
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মেলে সওয়াব
দেশ রক্ষার আন্দোলনে যারা মারা যান, তারা শহীদ। নিজের জীবন রক্ষা, পরিবারের সদস্যদের বাঁচানো ও সম্পদের হেফাজত করা ইমানি দায়িত্ব। এসব কাজ করতে গিয়ে যদি কেউ মারা যান, তিনি শহীদি মর্যাদা পাবেন। মুসলমানদের জীবন বাঁচানো ও মুসলিম দেশ রক্ষার জন্য সীমানা পাহারা দেওয়া বড় সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম দেশের সীমান্ত একদিন আর এক রাত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও উত্তম। আর যদি কেউ এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মারা যায়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত তার সওয়াব অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে। আল্লাহ তাকে জান্নাতের রিজিক দেবেন আর সে কবরের পরীক্ষার ভয় ও ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৯২)
আল্লাহর বিধানের বাস্তবায়ন
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন করে। স্বাধীনতার চেতনা নিয়েই শিশু জন্মায়। কিন্তু শিশুর বাবা-মা তাকে নিজস্ব মতবাদের ওপর গড়ে তুলে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, স্বাধীন মানুষ ও রাষ্ট্র ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আল্লাহর বিধান মেনে চলবে। দেশে নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে। জাকাত প্রদান করবে। মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা এমন লোক যাদের আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য (রাষ্ট্র ক্ষমতা) দান করলে তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে এবং সৎকাজে আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছাধীন।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৪১)
দেশের নিরাপত্তায় দোয়া করা
মক্কাকে নিরাপদ রাখার জন্য ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। আমরাও আমাদের দেশ রক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে সব সময় এ দোয়া করব—
উচ্চারণ: ‘রাব্বিজআল হাজাল বালাদা আমিনা, ওয়াজ নুবনি, ওয়া বানিইয়া আন নাবুদাল আসনাম।’
অর্থ: হে আল্লাহ, এই শহরকে শান্তিময় করে দাও। আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৫)




