
আব্বা আমাদের একটা ঘটনা প্রায়ই শোনান। ঘটনা এমন—বাবা বৃদ্ধ, ছেলে ২৫ বছরের যুবক। বাবা সদ্য ঝাড়ু দেওয়া উঠোনে চাটাই পেতে বসে আছেন। সূর্যের নরম লাল আলো পৃথিবীতে মায়া ছড়িয়ে বিদায় নিচ্ছে। সারা দিনের ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঘরে ফিরলেন ছেলে। বাবা তাকে ডেকে পাশে বসালেন। উঠোনের বিদ্যুতের তারের দিকে আঙুলের ইশারা করে জানতে চাইলেন, ‘বাজান, এটা কি?’ জবাবে ছেলে বললেন, ‘কাক।’ বাবা আবার জানতে চাইলেন। ছেলে জবাব দিলেন। এভাবে কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর ছেলে রেগেমেগে ধমক দিয়ে বললেন, ‘আর কতবার বলব—এটা কাক। চোখে দেখ না, নাকি কানে শোনো না।’
ছেলে বিরক্ত হয়ে চলে যেতে চাইলে বাবা থেমে থেমে বললেন, ‘শোনো, তোমার বয়স তখন চার-পাঁচ। সবে আশপাশের মানুষদের ভালো করে চিনতে শুরু করেছ। কথাবার্তা শিখছ। নতুন কোনো কিছু দেখলেই জিজ্ঞেস করো, এটা কি, ওটা কি। আমাদের ভালো লাগত তখন। একদিন বিকেলে তুমি আর তোমার আম্মা উঠোনে চাটাই পেতে বসে আছ। আমি কাজ থেকে ফিরেছি। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরে তোমাদের পাশে বসলাম। সেই বিকালেও এরকম বিদ্যুতের তারে কাক এসে বসল। তুমি জানতে চাইলে, ‘বাবা এটা কি?’ বললাম, কাক। মনে পড়ে, তুমি বোধ হয় দশ-পনেরো বার জিজ্ঞেস করেছিলে। প্রতিবার হেসে হেসে বলেছিলাম, এটা কাক। একটিবারের জন্যও বিরক্ত হইনি আমি।’
আপনার পত্নী কিংবা যে কোনো গর্ভবতী নারীর কথা ভেবে আপনার মায়ের কথা ভাবুন। গর্ভবতীর কষ্ট, বাচ্চা প্রসবের তীব্র যন্ত্রণা, বাচ্চা হওয়ার পর তার যত্ন, রাতভর জেগে থেকে বাচ্চার লালন-পালনের দৃশ্যগুলো কল্পনা করুন। গভীর রাতে বাচ্চার চিৎকারে ঘুম টুটে যাওয়া মন কেমন লাগে। কিংবা কোনো কারণে রাত একটায় আপনার ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর দেখলেন, আপনার স্ত্রী বাচ্চাকে নিয়ে খেলছে। দুধ খাওয়াচ্ছে পরম যত্ন করে। তখন আপনার হৃদয়ে কীসের দোলা দিয়ে যায়! হ্যাঁ, এই পর্যায়গুলো আমাদের সব মা-বাবাই অতিক্রম করেছেন।
সন্তানের ঠান্ডার ভয়ে মা ঠান্ডা পানীয় কিংবা আইসক্রিম খাওয়া ভুলে যান। বেড়াতে যাওয়া প্রিয় জায়গাগুলো স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেন। বাবা সেই তারুণ্যের দুরন্তপনার সব অভ্যাস ছেড়ে দেন। তার জীবনের বৈচিত্র্য কমে যায়। মাঝেমধ্যে বাবারা নিজের দিকে তাকিয়ে বড্ড অবাকই হন। ভাবেন, এতটা বদলে গেলাম আমি। হ্যাঁ, সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা মা-বাবাদের বদলে দেয়।
আমাদের অস্তিত্বের প্রকাশ জুড়ে আছে মা-বাবার আত্মত্যাগ। তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বদৌলতে সন্তান বেড়ে ওঠে। তাদের ঘাম, রক্ত চুষে সন্তান বেঁচে থাকে। সন্তানের সুস্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশে তাদের জীবন ক্ষয় হতে থাকে। সুতরাং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করতে হবে। তাদের প্রতি বিরক্ত হওয়া যাবে না। তাদের সেবা করতে গিয়ে মনে মনেও ‘উফ’ বলা যাবে না। ধমক দেওয়া তো প্রশ্নই উঠে না।
মা-বাবার ত্যাগ ও কষ্টের মূল্যায়ন করে আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও আর বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করো, যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩-২৪)
কোরআনে আছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। তোমরা মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬)
সবসময় মা-বাবার আদেশ মানতে হবে। তাদের আনুগত্য থাকতে হবে। তবে তারা যদি আল্লাহর আদেশ অমান্য করা বা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে বলে, তাহলে তাদের কথা শোনা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তারা (মা-বাবা) তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুর শরিক করতে বাধ্য করেন, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। তবে এই দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে উপযুক্ত সদয় আচরণ করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৫)
আপনি প্রতিদিন সময় করে তাদের খোঁজখবর নিন। দূরে থাকলে নিয়মিত তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলুন। ভিডিও কলে তাদের দেখুন। তাদের ইচ্ছা ও স্বপ্নগুলো গুরুত্বসহকারে শুনুন। পছন্দনীয় জায়গায় ঘুরতে যান। মা-বাবার হাত দিয়ে তাদের আত্মীয়দের উপহার দিন। মা-বাবাকে জানিয়ে তাদের পিতা-মাতার নামে সদকা করুন। ভালো রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়ে আসুন কিংবা নির্জন কোনো জায়গায় গিয়ে গল্প করুন। সামর্থ্য থাকলে মা-বাবার হজ-ওমরাহর ব্যবস্থা করুন কিংবা এখন থেকেই অল্প অল্প করে মা-বাবার জন্য হজ-ওমরাহর টাকা জমাতে শুরু করুন। সর্বোপরি তারা খুশি হবেন, এমনভাবেই নিজেকে পরিচালনা করুন।




