
‘দূরপাল্লার বাস। এক নারী যাত্রী তার কিশোরী মেয়েকে নিয়ে ঘুমে বিভোর। মা-মেয়ের পায়ের কাছে আরেক কিশোরী। সরু জায়গায় কোনো রকমে তার শরীরটি রেখেছে। গৃহকর্মী কিশোরীর জন্য আলাদা করে টিকিট কাটেননি গৃহকর্তা। তাই জড়সড় হয়ে পায়ের কাছে বসেই তাকে এতটা পথ ভ্রমণ করতে হচ্ছে। এমন অমানবিকতার চিত্র বছর তিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। ছবিটা দেখে মাথায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার পঙ্ক্তি ঘুরপাক খেয়েছিল—‘আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি, তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা আরও দেখেছি, রেস্তোরাঁয় নিজ সন্তানের প্লেট উপচানো খাবার কিন্তু এক কোনায় দাঁড়ানো গৃহকর্মী শিশুটির হাতে দুটি মাত্র ফেঞ্চফ্রাই। আবার রিকশার আসনে বসা বাড়ির লোকেরা আর রিকশার পেছনে ঝুলন্ত দাঁড়ানো অবস্থায় গৃহকর্মী। এমন অমানবিকতায় মানবিক হৃদয়গুলো দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। আবার বছরজুড়ে পত্রিকার পাতায় দেখা যায় গৃহকর্মী নির্যাতনের আরও ভয়াবহ খবর। (জোহরা শিউলী, প্রথম আলো: ১৫ জুন ২০২১)
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজ (বিলস) বলছে, সারা দেশে যত গৃহকর্মী আছেন তার ৯৫ ভাগের বেশি নারী। তারা ধর্ষণ, হত্যা এবং নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের বয়স ১০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে।
তারা বলছে, এই তথ্য পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে নেওয়া। বাস্তব অবস্থা আরও ভয়াবহ। গৃহকর্মীদের আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় তারা মামলা করতে চান না বা মামলা করলেও তা চালাতে চান না বলে জানায় বিলস।’ (ডয়চে ভেলে: ১৩ অক্টোবর, ২০২১)
রাজধানী ঢাকায় ৬৪ শতাংশ গৃহশ্রমিকের সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক কোনো ছুটি নেই। এছাড়া রাজধানীতে গৃহশ্রমিকদের ১৪ শতাংশই পেটে-ভাতে থাকেন। তাদের মাসিক কোনো বেতন দেওয়া হয় না। তবে যারা মাসিক বেতন পান, তাদের গড়ে ৪ হাজার ৬২৯ টাকা দেওয়া হয়। রাজধানীর গৃহশ্রমিকদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এ জরিপ প্রকাশ করেছে। (দৈনিক যুগান্তর: ১৪ জানুয়ারি, ২০২২)
এই হলো আমাদের দেশের গৃহকর্মীদের সঙ্গে মালিকের আচরণ। নির্যাতনের যে চিত্রগুলো দেওয়া হলো, এগুলো দৈনিক পত্রিকা কিংবা অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদ থেকে নেওয়া। এছাড়াও প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় গৃহকর্মী, কেয়ারটেকার, দারোয়ান ও কর্মচারী নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, যার খবর আমরা পাই না।
দেশে গৃহকর্মী ও কর্মচারীর পক্ষে আইন আছে। নামে-বেনামে সংগঠন আছে। আওয়াজ আছে। এরপরও তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না কোনোক্রমেই। তারা নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারছে না। কারণ মালিক বা স্যার তাকে আপন করে নিতে পারে না। ফলে প্রচণ্ড এই গরমের শহরে মালিক এসির ভেতর আরামে জীবনযাপন করলেও চাকরের জন্য থাকে না বৈদ্যুতিক পাখাও। অফিসে স্যারদের বিভিন্ন খাবারের আয়োজন থাকলেও পিয়ন তা পায় না।
হজরত মুহাম্মদের (সা.) আদর্শই নিশ্চিত করে মালিক-কর্মচারী বা গৃহকর্মীর মধ্যে সুসম্পর্ক। প্রতিষ্ঠা করে গৃহকর্মীর সুন্দর জীবনযাপনের অধিকার। কর্মচারী বা গৃহকর্মী নির্যাতন করা হারাম। তাদের সাধ্যের বাইরে কাজকর্ম দেওয়া জুলুম। তাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহের চাদর বিস্তৃত করা পুণ্যের কাজ। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের প্রতি সদয় আচরণের তাগিদ দিয়েছেন।
আমরা যদি মহানবীর নির্দেশনা অনুযায়ী অধীনস্থদের ভাই-বোন মনে করি, তাদের প্রতি সদয় আচরণ করি, তাদের অধিকার নিশ্চিত করি, তাহলে তারা পাবে মানবিক সুখের জীবন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তারা (অধীনস্থরা) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। কাজেই আল্লাহ যার ভাইকে তার অধীনস্থ করে দিয়েছে, তার (মালিক/দায়িত্বশীল কর্মকর্তার) উচিত, তাকে তা-ই পরানো, যা সে নিজে পরবে। আর তাকে এমন কাজের ভার দেবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে। তার ওপর অধিক কাজের দায়িত্ব চাপানো হলে যেন (দায়িত্বশীল ব্যক্তি) তাকে সাহায্য করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪৫)
মুহাম্মদ (সা.) এমন এক সমাজে জন্মেছেন, যে সমাজে খাদেম বা কর্মচারীর কোনো অধিকার ছিল না। তারা কর্মচারীদের মানুষ মনে করত না। তাদের কাছে কর্মচারীদের জীবন ছিল পশুর মতো। তারা সারা দিন গায়-গতরে খেটেও খাবার পেত না। কাজ শেষে পারিশ্রমিক পেত না ঠিকমতো। পান থেকে চুন খসলেই নির্যাতনের বিভীষিকা বয়ে যেত তাদের ওপর। আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত করে দিত। প্রখর রোদে তপ্ত বালুর ওপর অর্ধনগ্ন করে শোয়ায়ে রাখত। ফুটন্ত পানির ওপর পিঠ চেপে ধরত। গলায় রশি বেঁধে সারা শহর টেনে-হেঁচড়ে বেড়াত।
এরকম সমাজ ও মানুষের ভিড়ে মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অনন্য। তাঁরও কর্মচারী ছিল। জায়েদ বিন হারেসা (রা.) নবুওয়াতের আগেও তাঁর খাদেম বা কর্মচারী ছিলেন এবং নবুয়তের পরেও। আনাস বিন মালেক (রা.) ছিলেন তাঁর খাদেম। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদও (রা.) তাঁর জুতা বহন করতেন। আরও অনেক সাহাবি তাঁর খেদমত করতেন। তাঁর সেবায় সাহাবিরা নিজেদের নিবেদিতপ্রাণ রাখতেন। তারা কোনো দিন নবীর ব্যাপারে কোনো ধরনের অভিযোগ করেননি। যে সমাজে গোলাম নির্যাতন, তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিতকরণ স্বাভাবিক ঘটনা ও নিত্যনৈমত্তিক কাজ; সে সমাজে তিনি কখনো কর্মচারীকে বকা দেননি। প্রহার করেননি। অধিকার থেকে বঞ্চিত করেননি।
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো খাদেম এবং কোনো নারীকে মারধর করেননি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৬)
একদিন আল্লাহর রাসুল (সা.) মক্কার পথ ধরে হেঁটে চলছেন। দেখলেন, আবু মাসউদ (রা.) তাঁর গোলামকে প্রহার করছে। তিনি থেমে গেলেন। তাঁকে হাক ছেড়ে হুঁশিয়ার করলেন। সেদিনের ঘটনাটি কেমন ছিল তাহলে আমরা শুনে আসি আবু মাসউদ (রা.)-এর জবানি থেকে। আবু মাসউদ (রা.) বলেন, ‘কোনো এক সময় আমি আমার গোলামকে প্রহার করছিলাম। তখন আমার পেছন থেকে একজন লোককে আমি বলতে শুনলাম—আবু মাসউদ, জেনে রেখো। আবু মাসউদ, জেনে রেখো। আমি পেছন তাকানো মাত্রই দেখতে পাই রাসুল (সা.)। তিনি বলেন—তুমি এর ওপর যে পরিমাণ ক্ষমতার অধিকারী, তোমার ওপর আল্লাহ তাআলা এর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী। আবু মাসউদ বলেন, এরপর থেকে আমি আমার কোনো কর্মচারীকে আর কখনো মারিনি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪৮)
কর্মচারী নির্যাতনের দৃশ্য প্রিয় নবীর (সা.) বুকের ভেতর হাহাকার বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভাঙচুর করেছিল তাঁর মনের মণিকোঠা। তিনি হুঁশিয়ার কণ্ঠ উচ্চারণ করেছেন নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সমস্ত জীবনজুড়ে মানুষের জন্য শুধু রহমত কামনা করেছেন। তাঁর রহমতের বিস্তৃতি ছিল সবার জন্য সমান। তিনি কর্মচারীদের অধিকার রক্ষা ও নিরাপদ জীবনের লক্ষে এমন এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেন, ফলে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী ও মুহাম্মাদ (সা.)-এর আদর্শ লালনকারী মালিকপক্ষ কখনোই খাদেম, কর্মচারী ও গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন করতে পারে না। তিনি বলেছেন, ‘অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে যেতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪৬)
আমরা বিশ্বাস করি, যদি কোনো মুসলমানের ভেতর আল্লাহর ভয়, রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রতি ভালোবাসা, জান্নাতের প্রত্যাশা ও জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা থাকে, তাহলে সে গৃহকর্মী ও অধীনস্থদের নির্যাতন করবে না।
মনে রাখতে হবে, সবই অর্থ-বিভবে বিত্তশালী হলে কর্মচারী পাওয়া যেত না। রিকশাচালক বা নৌকাচালক পাওয়া যেত না। কাজের লোক মিলত না। ধনী-গরিবের এই পার্থক্য আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শন। পৃথিবীর ভারসাম্য ঠিক রাখার অনন্য উপাদান। তাই কোনোভাবেই কর্মচারী বা কাজের লোকদের সঙ্গে মন্দাচারণ করা যাবে না।




