স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকা কর্মসূচির (ইপিআই) ওয়েবসাইটে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ না হওয়ায় গত বছরের হামের টিকাদানের তথ্য নিয়ে দেশব্যাপী বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশুর হাসপাতালে ভর্তি এবং কয়েকটি জেলায় মৃত্যুর ঘটনায় সেই বিভ্রান্তি আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কঠোর সমালোচনায় পড়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার।
তবে সমালোচনার পর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বলছে, টিকাদানের তথ্য হালনাগাদ করতে না পারায় এমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতি শুধু নয়, তাদের সচেতনতা না থাকায় মূলত এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ইপিআই জানায়, ২০২৫ সালে ৬০ শতাংশ নয়, হামের টিকা কাভারেজের হার ছিল প্রায় ৯২ শতাংশ। এর মধ্যে মিজেলসের (হাম) এমআর-১ (প্রথম ডোজ) পেয়েছে ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং এমআর-২ (বুস্টার ডোজ) পেয়েছে ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গড় কাভারেজের হার ছিল ৯১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে গাফিলতির কথা স্বীকার করেন ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘ড্যাশবোর্ড হালনাগাদ করতে না পারায় মূলত এই সমস্যা হয়েছে। আগে এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) তৈরি, তথ্য হালনাগাদ করার মতো জনবল অনেক ছিল। কিন্তু ওপি (অপারেশন প্ল্যান) বন্ধ হওয়ায় সেই জনবল আর নেই। ওপি থেকে সরে আসায় আমাদের অনেক কাজেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন ও কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানোর মতো কর্মসূচিগুলো করা সম্ভব হয়নি। সবকিছুতে এখন চাপে পড়ে যাচ্ছি।’
ইপিআইয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৪২ লাখ ২৮ হাজার ৬২৯ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এমআর-১ দেওয়া হয়েছে ৩৮ লাখ ২৮ হাজার ৬২৪ জন এবং এমআর-২ পেয়েছে ৩৭ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯ জন; যা মোট শিশুর ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ ও ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গড়ে যা ৯২ শতাংশের কাছাকাছি আর আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ কম। ২০২৪ সালে প্রথম ডোজের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছিল ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ শিশুকে।
শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আক্রান্ত রোগী যাতে না বাড়ে, মৃত্যু না ঘটে, সে জন্যই টিকাদানে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। আমরা নিজেদের কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকায় বিভ্রান্তি দূর করে আসল তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো সম্ভব হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘৬টি টিকার মজুত শেষ হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে গাভি হামের টিকা দিয়েছে। একই সঙ্গে আইপিভি (পোলিও টিকা) টিকা চলে এসেছে। আমাদের টাকা আছে, শুধু ব্যবস্থাপনার ত্রুটি কিংবা দুর্বলতার কারণে ভ্যাকসিন আসছিল না। এখন আসা শুরু হয়েছে। মাঠপর্যায়ে আমরা খোঁজ নিয়েছি। যেখানে কোনো উপজেলা না থাকলেও পাশের উপজেলায় দ্বিগুণ টিকার সংগ্রহ রয়েছে। সেটি সমন্বয় করে দেখা যাচ্ছে, নিশ্চিতে এক মাস চলে যাবে।
টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে এমন ধীরগতি জানিয়ে ইপিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘১৯৭৯ সাল থেকে যে প্রক্রিয়ায় টিকা কেনা হয়েছে, হঠাৎ তাতে পরিবর্তন হওয়ায় মূলত সমস্যা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে তিনটি ভিন্ন পদ্ধতিতে টিকা কিনতে হয়েছে, তাই কাজে ধীরগতি এসেছে।’
তবে বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত ও অনেকের মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য অধিপ্তরের হালনাগাদের প্রকাশিত তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবুল জামিল ফয়সাল।
এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বতী সরকারের সময়ে অনেক সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি করে নেওয়া হয়েছে। ওপি থেকে এভাবে সরে আসলে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটি চিন্তা করা হয়নি। একজন বিশেষ সহকারী উপদেষ্টা একটা সিদ্ধান্ত দিল, অন্যরা সেটির ভালো-মন্দ চিন্তা না করেই একমত হলো। কাজেই স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতি শুধু নয়, তাদের সচেতনতা না থাকায় মূলত এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’
আবুল জামিল ফয়সাল আরও বলেন, ‘টিকাদানের যে তথ্য হালনাগাদের কথা বলা হচ্ছে, আমার তা বিশ্বাস হয় না। যখন শিশুরা মারা যাচ্ছে, এমন সময়ে হঠাৎ হালনাগাদের তথ্য বেরিয়ে আসছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’




