ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবেগ আর লাখো মানুষের সমাগমে আবারও মুখরিত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন এই ঈদগাহে শনিবার (২১ মার্চ) সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত। তবে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগেই, সকাল ৯টার মধ্যেই পুরো ঈদগাহ মুসল্লিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
ভোর থেকেই কিশোরগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায় দেখা যায় মুসল্লিদের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষ রিজার্ভ বাস, ব্যক্তিগত যানবাহনসহ নানা মাধ্যমে আগেই উপস্থিত হন ঈদগাহ প্রাঙ্গণে। ঈদের নামাজকে ঘিরে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। ঈদের জামাতে ইমামতি করবেন স্থানীয় বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। প্রস্তুত করা হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা।
নোয়াখালীর সেনবাগের দেলোয়ার হোসেন, চার বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তিনি এবার একাই শোলাকিয়ায় আসেন। সঙ্গে ছিলেন বোন জামাই মোস্তফা ও ছেলে আইয়ান হোসেন শাহীন।
শুক্রবার (২০ মার্চ) সেহরি খেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা কিশোরগঞ্জে পৌঁছান। প্রথমে তারা ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। পরে শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিদর্শন শেষে অবস্থান নেন ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির নির্ধারিত মসজিদ বাগে জান্নাতে। সেখানেই রাত্রিযাপন করে ঈদের জামাতে অংশ নেন।
দেলোয়ার বলেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। চার বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে কথা দিয়েছিলাম শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়ব। তারা না এলেও আমি আমার কথা রেখেছি। তার সঙ্গে থাকা মোস্তফা জানান, শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় এবং পাগলা মসজিদে জুমার নামাজ-দুটিই তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল, যা এবার পূরণ হয়েছে।
ঐতিহাসিক সূত্র ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, বারোভূঁইয়া নেতা ঈশা খাঁর বংশধর শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ এক ঈদের মোনাজাতে মুসল্লিদের বিপুল সমাগমকে ‘সোয়া লাখ’ বলে উল্লেখ করেন। সেখান থেকেই ‘সোয়া লাখিয়া’ শব্দের অপভ্রংশ হয়ে ‘শোলাকিয়া’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্য একটি মতে, এক ঈদ জামাতে প্রায় সোয়া লাখ (১ লাখ ২৫ হাজার) মুসল্লির উপস্থিতির পর থেকেই এই নামটি প্রচলিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ ঈদগাহের জন্য ৪.৩৫ একর জমি ওয়াকফ করেন। বর্তমানে ঈদগাহটি প্রায় ৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত।
বিপুল এই ধারণক্ষমতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে শোলাকিয়ার ঈদুল ফিতরের জামাতকে উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদের জামাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি বছরই ঈদের দিন লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শোলাকিয়া পরিণত হয় এক অনন্য ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনমেলায়।
২০১৬ সালের ৭ জুলাই শোলাকিয়া ঈদগাহ এলাকায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্য, এক নারী ও এক জঙ্গিসহ চারজন নিহত হন। আহত হন পুলিশসহ ১৬ জন মুসল্লি। ওই ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হলেও ঈদের জামাতে মুসল্লিদের অংশগ্রহণে কোনো প্রভাব পড়েনি।




