সবাই কথা রাখে না, কিন্তু কেউ কেউ রাখে নিজের মতো করে- নীরবে, দৃঢ়ভাবে। নোয়াখালীর সেনবাগের দেলোয়ার সেই গল্পেরই একজন মানুষ, যিনি চার বছর আগের একটি প্রতিশ্রুতিকে আজও বুকে ধরে রেখেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে ঠিক হয়েছিল, একদিন সবাই মিলে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করবেন। সময়ের সঙ্গে সেই দল ভেঙে গেছে, ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছে প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দেলোয়ারের কাছে বিষয়টি ছিল ভিন্ন। বন্ধুরা না এলেও তিনি থামেননি।
তবে বন্ধুরা না এলেও দেলোয়ার একা আসেননি, সঙ্গে এনেছেন বোন জামাই মোস্তফা ও ছেলে আইয়ান হোসেন শাহীনকে। সেহরি খেয়ে শুরু হয় তাদের যাত্রা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান কিশোরগঞ্জে। দুপুরে ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন, যা ছিল তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এরপর শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ ঘুরে দেখেন। লাখো মুসল্লির সমাগমস্থল সেই প্রান্তর যেন আগেই তাদের মন ভরে দেয়।
বর্তমানে তারা অবস্থান করছেন ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির নির্ধারিত মসজিদ বাগে জান্নাতে। সেখানেই রাত্রিযাপন করছেন, শনিবার (২১ মার্চ) সকাল ১০টায় ঈদের জামাতে অংশ নেবেন।
দেলোয়ার বলেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। চার বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে কথা দিয়েছিলাম। তারা না এলেও আমি আমার কথা রাখতে এসেছি।
অন্যদিকে মোস্তফার চোখে এই সফর শুধু নামাজ নয়, অনুভূতির এক যাত্রা। তিনি বলেন, ‘শ্যালক বলল শোলাকিয়ায় নামাজ পড়বে, তাই চলে আসি। পাগলা মসজিদে নামাজ পড়ার ইচ্ছা ছিল অনেকদিনের, সেটাও পূরণ হয়েছে। আর শোলাকিয়ার ঈদের জামাত- এটা সত্যিই অন্যরকম এক অনুভূতি।’
ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে প্রশাসন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ঈদ জামাতকে ঘিরে পুলিশের পক্ষ থেকে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করবেন সদস্যরা। র্যাব ও এন্টি-টেররিজম বোম ডিসপোজাল ইউনিটও মাঠে সক্রিয় থাকবে। ঈদগাহে প্রবেশের আগে মুসল্লিদের একাধিক চেকপোস্ট ও পিকেট অতিক্রম করতে হবে, কোথাও কোথাও পাঁচ থেকে ছয়টি নিরাপত্তা স্তর পেরিয়ে ময়দানে প্রবেশ করতে হবে।
পুলিশ সুপার বলেন, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, মেডিকেল টিম ও কুইক রেসপন্স ইউনিট। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিট অংশ নেবে এই কার্যক্রমে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিতব্য ঈদের জামাতকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে বহুস্তর নিরাপত্তা বলয়। এবারও মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে। মোবাইল ফোন ও ব্যাগ বহনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তিনি জানান, ঈদগাহ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় বসানো হয়েছে ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা। এ ছাড়া ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবে পুলিশ ও র্যাব। নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকবে প্রায় ১১০০ পুলিশ সদস্য, র্যাবের ছয়টি টিম, পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, পাঁচ প্লাটুন আনসার এবং চার প্লাটুন সেনাবাহিনী। পাশাপাশি থাকবে ড্রোন নজরদারি, মেটাল ডিটেক্টর, আর্চওয়ে ও একাধিক চেকপোস্ট। দায়িত্ব পালন করবেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে চালু করেছে ‘শোলাকিয়া স্পেশাল’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন। এর মধ্যে একটি ভোর ৬টায় ভৈরব থেকে এবং অপরটি সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসবে।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে রাখা হয়েছে তিনটি খাবার পানির ভ্যান, যেখানে প্রায় ৩ হাজার লিটার পানির ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া ছয়টি নলকূপ, পাঁচটি অস্থায়ী অজুখানা ও ১৫টি অস্থায়ী টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, ঈদ জামাত শুরুর আগে বন্দুকের গুলির মাধ্যমে সংকেত দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগে তিনটি, ১০ মিনিট আগে দুটি এবং ৫ মিনিট আগে একটি গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের সতর্ক করা হবে- যা শোলাকিয়ার দীর্ঘদিনের বিশেষ রেওয়াজ।




