
আজ বিশ্ব মা দিবস। মা মানেই মমতা, মা মানেই নির্ভরতা। তবে মৌলভীবাজারের পাহাড়ঘেরা সবুজ চা বাগানে যারা মা, তাদের জীবনের গল্পটা কেবলই এক সংগ্রামের নাম। তাদের জন্য মা দিবস মানে কোনো উদযাপন নয়, বরং পিঠে ঝুড়ি বেঁধে সেই চেনা হাড়ভাঙা খাটুনি।
চা বাগানের এই মায়েদের দিন শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার আগে। দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে শুরু হয় উনুন সামলানোর কাজ। পরিবারের সবার জন্য রান্না শেষ করে সকাল ৯টার আগেই তাদের ছুটতে হয় বাগানের সেকশনে। টানা ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পাতা তোলার পর যখন তারা বাড়ি ফেরেন, তখন সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু মায়েদের ছুটি নেই। ঘরে ফিরে আবার শুরু হয় রান্নাবান্না আর গৃহস্থালির কাজ। একেই তারা বলেন বাইরেও জ্বালা, ঘরেও জ্বালা।
সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে পিঠে ঝুড়ি নিয়ে দুই পাতা একটি কুঁড়ি তুলছেন এক মা। পর্যটকদের ক্যামেরায় এই দৃশ্য যতটা মোহনীয় বা নান্দনিক, সেই ঝুড়ির ভারে ন্যুব্জ মায়ের জীবন ঠিক ততটাই বিষাদময়। চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজারের নারী চা শ্রমিকদের কাছে মা দিবস মানে বাড়তি কোনো পাওনা নয়, বরং রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পরিবারের মুখে অন্ন জোগানোর আরেকটি নিরন্তর যুদ্ধের দিন।
শনিবার (৯ মে) দিনভর মৌলভীবাজারের পাত্রখোলা, মাধবপুর, চাম্পারায় চা বাগানে গিয়ে নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তারা বলেন, সারাদিন বাগানে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করার পর বাড়িতেও আমাদের শান্তি নেই। জীর্ণ টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ে ঘরের বিছানা ভিজে যায়। সেকশনেও ভিজি আমরা, ঘরেও ভিজি। শুধু তাই নয়, সুপেয় পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা আমাদের কাছে আজও বিলাসিতা। ঘরে বাইরে সবখানেই আমরা নানাভাবে বঞ্চিত ও নির্যাতিত। ভূমির অধিকারহীন এই মায়েরা বংশপরম্পরায় কেবল শ্রম দিয়ে গেলেও নিজের এক টুকরো মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে পারছেন না।

জানা গেছে, বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও জীবনযুদ্ধের হাত থেকে নিস্তার নেই তাদের। যেখানে সারা বিশ্বের মায়েরা এই বিশেষ দিনে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হন, সেখানে চা বাগানের মায়েরা কাঁচা পাতা মেপে দিন শেষে সামান্য মজুরির আশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
মাধবপুর চা বাগানের চা শ্রমিক মা আশা কুর্মী ও কাজল বোনার্জী আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাবু হামরা ছারাদিন পানি দেকে ভিজি, ঘামসে পুড়ি। বুজলে বাবু, হামরা ঘরে যাকে শান্তিসে রইবজা, কিন্তু হামনিকে নসীব খারাপ। বাহিরমে পানিসে ভিজেনিজা, ঘরমে আকে একি অবস্থা হয়েলা। হামনিকে মাই বাবু দিবস কাই জানকে হামরা কা কর। হামনিকে ঘরমে জ্বালা, বাহিরমে জ্বালা।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমাদের নারী চা শ্রমিকদের কাছে মা দিবস মানে আলাদা কিছু নয়। প্রতিদিনের মতো আজও তারা ভোরবেলায় উঠে ঘরের কাজ সেরেছেন, সন্তানদের জন্য কোনোমতে দুমুঠো অন্নের ব্যবস্থা করে বেরিয়ে পড়েছেন বাগানের পথে।
তিনি আরও বলেন, রোদ পুড়ুক বা বৃষ্টি নামুক, ঝুড়ির ওজন পিঠে নিয়ে তাদের মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। হাড়ভাঙা খাটুনির পর দিনশেষে তারা যে মজুরি পান, তা দিয়ে এই দূব্যমূল্যের বাজারে সন্তানদের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দেওয়া তো দূরের কথা, নুন ভাত জোগাড় করাও দায়।




