বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে ছোঁয়াচে রোগ হাম-রুবেলার চিকিৎসায়। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত থাকায় অতিরিক্ত গরমের কারণে রোগীদের শরীরে র্যাশ (ফুসকুড়ি) বেড়ে যাচ্ছে। এতে রোগীদের দ্রুত সুস্থ করে তোলার বিষয়ে চিকিৎসদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় অনেক চিকিৎসক সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে রোগীর স্বজনদের। সংক্রমণ পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৪০ দিনে (১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল) দেশে হাম উপসর্গ নিয়ে ২০৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাম শনাক্ত হওয়া রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা ৪২। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা) হাম উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১১ শিশু।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়েছে ৫৮ জেলায়। এর মধ্যে একটি জামালপুর। জামালপুরে হামের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে জেলা সদরে অবস্থিত জেনারেল হাসপাতালে। রোগীদের জন্য হাসপাতালে ১০ শয্যা বিশিষ্ট আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এই ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের একজন ডা. নুসরাত জাহান।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব নিয়ে শনিবার (২৫ এপ্রিল) তার সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। নুসরাত জাহান বলেন, এই ধরনের রোগীদের শরীরে জ্বরের পাশাপাশি অনেক বেশি র্যাশ থাকে। যেহেতু এখন গরম বেশি, অ্যালার্জি থাকা মানুষের শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে আছে লোডশেডিংয়ের সমস্যা। সবমিলিয়ে হাম আক্রান্তদের মধ্যে এর প্রভাব আরও বেশি।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে দুই-তিন দিন ধরে হাম উপসর্গ নিয়ে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে। হাম রোগীদের ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীর চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত থাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদেরও শরীরে র্যাশ বেড়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ
জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩০ মার্চ থেকে হাসপাতালে হাম উপসর্গ নিয়ে রোগী আসা শুরু হয়। সবশেষ শনিবার (২৫ এপ্রিল) পর্যন্ত ১২০ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৪ জন সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন। বর্তমানে ২৬ জন শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
মেলান্দহ উপজেলা থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) শিশুসন্তান সিয়ামকে হাসপাতালে আসেন রিপন মিয়া। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা রয়েছে তার অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা রোগীর কাছে আসতে চান না। তারা এটাকে (হামকে) করোনার মতো ভয় পাচ্ছেন। প্রতিদিন নিজে গিয়ে নার্সদের কাগজ দেখানো লাগে। আমি ছেলেকে নিয়ে থাকি চারতলায়, ওষুধ নিয়ে আসা লাগে বাইরে থেকে। এর মধ্যে আবার ৩-৪ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না।’
একই ধরনের অভিযোগ করেন হাম উপসর্গ নিয়ে পাশের বেডে থাকা ৬ মাস বয়সি সাদিয়ার মা শিলা বেগম। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। বাচ্চা তো অসুস্থ। স্বজনারাও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। সারা দিন হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হয়। ডাক্তাররা ঠিকমতো আসে না। ডেকে নিয়ে আসতে হয়। নার্সদের কাছে গেলে তারা খারাপ ব্যবহার করেন।’
সংশ্লিষ্টদের জবাব
এ বিষয়ে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান সোহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এতগুলো রোগী আসছে, আমরা তাদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। তাহলে কীভাবে ডাক্তাররা চিকিৎসা দিচ্ছে না? আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
জামালপুরের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, বিষয়টি করোনার মতো আশঙ্কাজনক নয়। প্রাপ্তবয়স্ক যারা তারা গেলেই যে হাম আক্রান্ত হবে ব্যাপারটা এরকম নয়। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ক্ষতিয়ে দেখা হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বেগ
দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, প্রাদুর্ভাবের একটি বড় উদ্বেগ হলো–অনেক শিশু হয় টিকা পায়নি, নয়তো হাম প্রতিরোধী টিকার এক ডোজ পেয়েছে। কিছু শিশু ৯ মাস বয়সে টিকার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। ৯১ শতাংশ রোগী ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি; যা শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এবারের প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছিল। হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজ প্রয়োগের হার ২০০০ সালে ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে প্রয়োগের হার ছিল ২২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর হার দ্রুত কমে এসেছিল।
তবে ২০২৪-২৫ সালে দেশে জাতীয় পর্যায়ে টিকার ঘাটতির কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ বা এমআর১ ও এমআর২ প্রয়োগ কমে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না থাকা। এসব কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে এবং বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।
টিকা না পাওয়া ও আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে এমন শিশুরাও আছে, যাদের বয়স টিকা পাওয়ার জন্য এখনও যথেষ্ট হয়নি। এটি অব্যাহত সংক্রমণ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে এবার হাম নির্মূলে বাংলাদেশের আগের অগ্রগতিতে ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। জরুরি ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ আরও ছড়াতে পারে। তাই নজরদারি শক্তিশালী করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও মোকাবিলা করা এবং ভালো মানের টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি পূরণ করা জরুরি।
হাম আসলে কী, কেন হয়?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, হাম প্রকৃপক্ষে একটি মারাত্মক ভাইরাল ডিজিজ। মায়াসলেস ভাইরাস নামের একটি ভাইরাসের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। টিকার মাধ্যমে ভাইরাসটি বহু বছর ধরে আমরা প্রতিরোধ করে আসছি। এবার একটু ব্যত্যয় ঘটতে দেখা গেল। যেখানে আগে হাম হতোই না, সেখানে এবার মহামারি আকার দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে, একজন শিশু আক্রান্ত হলে অন্তত ১৬ থেকে ১৭ জন পর্যন্ত শিশু আক্রান্ত হতে পারে। হামে যদিও সরাসরি মৃত্যু ঘটে না। কিন্তু হাম প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় তার ফলে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে বাচ্চা মারা যেতে পারে। তার মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি ভিটামিন এ কমিয়ে দেয়।
হামের চিকিৎসা কী?
ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, হাম যেহেতু সংক্রমণ সুতরাং এখানে একটি সাধারণ লক্ষণ হলো গলাব্যথা, হাঁচি, কাশি হতে পারে। এরপর গায়ে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দিতে পারে। বর্তমানে যদি জ্বর আসে শরীরের র্যাশ দেখা দেয়, তাহলে ধরে নিতে হবে এটি হাম।
তিনি বলেন, যেহেতু এটি ভাইরাল ডিজিজ, কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চিকিৎসা নেই। তবে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দিতে হয়। জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল কিংবা যেসব ব্যবস্থা নিলে জ্বর কমবে, তা নিতে হবে। হামের প্রভাবে নিউমোনিয়া দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন দিতে হবে।




