বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর মাজার প্রাঙ্গণের দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুরের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে পশুপ্রেমীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় প্রশাসন তদন্তে নেমেছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর ২টার দিকে এই ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটির প্রধান করা হয়েছে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ছায়েব আলী এবং সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কুকুরটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল। পৌর এলাকায় এ ধরনের কুকুর শনাক্ত হলে টিকাদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে মাজার-সংলগ্ন দিঘিতে দীর্ঘদিন ধরে কুমির বসবাস করছে, যা এই এলাকার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী এখানে মানত নিয়ে আসেন এবং কুমিরকে হাঁস, মুরগি ও ছাগল দেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মানতের পশু কুমিরকে না দিয়ে কিছু খাদেম ও ফকির আত্মসাৎ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে মানতের পশু পুনরায় বিক্রি করে আসছে। দিঘিতে ফেলার পর দ্রুত পশু তুলে এনে অন্যদের কাছে বিক্রি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে জানান তারা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাজারের খাদেমরা। তাদের দাবি, দর্শনার্থীদের হয়রানি করা হয় না এবং কুমিরকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয়।

মাজারের নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান জানান, কুকুরটি অসুস্থ ছিল এবং যাকে পাচ্ছিল তাকেই কামড় দিচ্ছিল। ঘটনাদিন কয়েকজনকে কামড় দেওয়ার পর সেটি পানিতে পড়ে গেলে কুমির কাছে চলে আসে। ভয়ে তখন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মাজারের ঘাটের পাশের দোকানি বিনা ফকির বলেন, ‘কুকুরটি তার দোকানের সামনে কয়েকজনকে আক্রমণ করে এবং একটি শিশুকেও কামড় দেয়। এমনকি তার একটি মুরগিও খেয়ে ফেলে। পরে কুকুরটি পানিতে পড়ে গেলে দিঘির কুমির সেটিকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি দাবি করেন, কুকুরটিকে বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়, কুকুরটি নিজেই পানিতে পড়ে যায়।’
মাজারের খাদেম মেহেদী হাসান (তপু) বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর। কুকুরটি আগে থেকেই অসুস্থ ছিল এবং কয়েকজন মানুষকে কামড়েছিল। সম্প্রতি ডিম পাড়ার পর কুমিরটি আক্রমণাত্মক আচরণ করছিল। কুমিরটি কুকুরটিকে আক্রমণ করলেও পরে সেটিকে অন্য জায়গায় ফেলে দেয়। পরে মাজারের দারোয়ান কুকুরটিকে উদ্ধার করে মাটিচাপা দেন। কুকুরটির হাত-পা বাঁধা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় হযরত খানজাহান আলী প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক দিঘি খনন করেন, যার মধ্যে খাঞ্জেলি দিঘি অন্যতম। ঐতিহ্য অনুযায়ী, দিঘির পানি সংরক্ষণে একসময় ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে দুটি কুমির ছাড়া হয়। পরবর্তীতে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে আরও ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে এখানে অবমুক্ত করা হয়। তবে ২০২৩ সালে একটি কুমির মারা গেলে অবশিষ্ট চারটি কুমিরকে সুন্দরবনের কুমির প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে।




