কৃষকের কথা চিন্তা করে আগামী পাঁচ বছরে সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরের সাহাপাড়ায় একযোগে দেশের ৫৪টি খালের খনন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, এই খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে আজকে দেশ গড়ার কর্মসূচি শুরু হলো। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেই বাংলাদেশের মানুষ তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে, সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। এই কর্মসূচি কতটুকু সফল হলো খোজ রাখব এবং খাল খনন সম্পন্ন হলে আবার দেখতে আসব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল কাটা জরুরি এজন্য যে, বাংলাদেশের সব খাল ভরাট হয়ে গেছে। এমনকি বর্ষা মৌসুমেও খরা হয় অনেক জায়গায়। পানির অভাবে চাষাবাদ করা যায় না। আমরা এই বর্ষার পানিটাকে কৃষিকাজে ব্যবহার করতে চাই। উজানের সময় যে পানি পাওয়া যাবে, সেটাকে ধরে রাখতে চাই। যাতে শুষ্ক মৌসুম এবং বর্ষা মৌসুম—দুভাবেই কৃষকরা উপকৃত হন। সমগ্র বাংলাদেশের কৃষকের উপকারে আগামী পাঁচ বছরে দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করব। যেটা আজ সাহাপাড়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি দল করি, যেই দলের কাজ হচ্ছে সেই কাজগুলো করা যে কাজগুলো করলে মানুষের উপকার হয়, যে কাজগুলো করলে মানুষ খুশি হবে। আমরা চেষ্টা করি সেই কাজগুলো করতে এবং সেই কারণেই আজ আমরা একত্রিত হয়েছি এই সাহাপাড়া খালটি পুনঃখননের কাজ শুরু করেছি। এই খালটি প্রায় ১২ কিলোমিটার লম্বা। যখন সম্পূর্ণভাবে কাজ শেষ করতে পারব, তখন ৩১ হাজার কৃষক এখান থেকে পানি নিয়ে ১২০০ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনতে পারবে। সাড়ে তিন লাখ মানুষ এই খালের পানির সুবিধা পাবে। শুধু তাই নয়, এই এলাকার কৃষক ভাই-বোনোর এখন যা ফসল উৎপাদন হচ্ছে তার থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন বেশি ফসল উৎপাদন হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমরা কৃষকের পাশে থাকতে চাই। আমরা নির্বাচনি ওয়াদা করেছিলাম- ভোটে জয়লাভ করলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার। সরকার গঠনের পরে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিএনপি কৃষকের কথা মনে রেখেছে। সেই বৈঠকে কৃষিঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করেছি।
কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বিরাট দেশ। ২০ কোটি মানুষের বসবাস এই দেশে। এত মানুষের জন্য খাবার-দাবার বিদেশ থেকে কি আনা সম্ভব। এই খাবার আমাদেরকে এই দেশেই উৎপাদন করতে হবে। বিশেষ করে ধান-চালসহ মৌলিক খাবারগুলো এই দেশে উৎপাদন করতে হবে। আমাদের দেশের মাটি উর্বর। শুধু খাল নয়, খালের দুই পাশে ৬০ হাজার বৃক্ষরোপণ করা হবে। খালের দুই পাশে চলাচলের জন্য রাস্তা করে দেওয়া হবে।’
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, খালে পানি না থাকায় আমাদের গভীর নলকূপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। আজ থেকে ১০ বছর আগে যতটুকু গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, এখন পানি পেতে আরও বেশি গভীরতা প্রয়োজন হয়। ওই পানি কমে গেলে আমাদের সকলকে বিপদে পড়তে হবে। এ জন্য মাটির উপরের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য মাটির গভীরের পানি রেখে দেওয়া যায়। খাল-নদী খনন করে আমাদের সেই পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার নির্বাচনি ওয়াদার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আমরা এরই মধ্যে সেই কাজটি শুরু করেছি। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এরই মধ্যে ৩৭ হাজার মা-বোনের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। ধীরে ধীরে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রংপুর অঞ্চলের সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। একটু সময় লাগছে। সরকারের বয়স মাত্র এক মাস।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারপরেও আমরা যে ওয়াদা করেছিলাম, সেই কাজগুলো শুরু করেছি। কৃষক ভাইদের জন্য যেভাবে সুদ মওকুফ করেছি, মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছি- একইভাবে কৃষক ভাইদের কৃষি কার্ড পৌঁছে দেব। যা আগামী মাস থেকে চালু হবে। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক ও মধ্যম চাষিদের কাছে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। যাতে করে এই কার্ডের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন। বিএনপি সরকার হচ্ছে কৃষকের বন্ধু। কৃষক ভালো থাকলে, কৃষাণি ভালো থাকলে বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে। বাংলাদেশের কৃষিকে আমরা শক্তিশালী ভিত্তির ওপর গড়ে তুলতে চাই।
উত্তরাঞ্চল কৃষি প্রধান এলাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক বড় বড় কোম্পানি আছে যারা কৃষিপণ্য নিয়ে মিল-কারখানা করেছে। আমরা এরই মধ্যে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি- এই এলাকায় কি কি কৃষি নির্ভর মিল-কারখানা গড়ে তোলা যায়। যাতে করে এখানকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই হচ্ছে বিএপির রাজনীতি। আমরা এমন কাজ করতে চাই, যেখানে প্রত্যেকের আয় দুই-চার বছরে দ্বিগুণ হয়ে যায়। এটাই হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি।
তিনি বলেন, এই দেশের মানুষই একাত্তর সালে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল, ২০২৪ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার বিদায় করেছিল। এই দেশের মানুষই শহীদ জিয়ার সময়ে খাল খননের মাধ্যমে দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদেশে রপ্তানি করেছিল। এই দেশের মানুষই সুন্দর আগামী গড়ে তুলবে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনা। আর সজাগ থাকতে হবে। যারা বিভিন্ন রকম কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা করতে চায়, মিষ্টি কথা বলে বিভ্রান্ত করতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা, মা-বোনদের সাবলম্বী করে তোলা, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে দেশের মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা, ভবিষৎ প্রজন্মকে মানুষ করে গড়ে তোলা। মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এই কাজ করতে হলে আমরা একা পারব না, জনগণকে সঙ্গে লাগবে। নির্বাচনের সময় যেমন সমর্থন দিয়েছেন, ঠিক সেভাবে এখনো আপনাদের সমর্থন ছাড়া দেশ উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেজন্য দেশের মালিক আপনারা জনগণ, মালিক সঙ্গে থাকলে আমরা যেকোনো পরিকল্পনা সফল করতে পারব।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আজ একযোগে দেশের ৫৪টি খালের খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধন শেষে তিনি খালের পাড়ে একটি বৃক্ষ রোপণ করেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাহাপাড়া খালটির দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই খালটির সঙ্গে পুনর্ভবা নদীর সংযোগ রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা এই নদী ঠাকুরগাঁও হয়ে দিনাজপুরে প্রবেশ করেছে, যা পঞ্চগড়ের মহানন্দা নদীতে গিয়ে মিশেছে।
জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-৩ আাসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।




