ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

১৩ দিনেই পাল্টে গেল তদন্ত প্রতিবেদন, দোষী থেকে ‘নির্দোষ’ পিডি তবিবুর

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক

  ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪৬
ইনসেটে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। ছবি : সংগৃহীত

নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার ভিত্তিতে এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে সেই অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’ বলে তাকে পুনর্বহালের আদেশ জারি করা হয়েছে।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তাকে নিয়ে দুই প্রজ্ঞাপনে বিপরীত বক্তব্য উঠে আসায় স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্তপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যাতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো বলে উল্লেখ করা হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা সমীচীন হবে।’

‘সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ধারা-৩৯(১) ও সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি-১২ অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরাখাস্তকালীন তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধিমোতাবেক খোরপোশ ভাতা প্রাপ্য হবেন। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।’

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ১৩ দিনের মাথায় গত ২২ এপ্রিল আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে জারি করা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে আগের প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হয়। শুধু তা-ই নয়, বরখাস্তকালীন সময়কেও চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের একই সচিবের সই করা এই প্রজ্ঞাপনেও বলা হয়, ‘মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক দায়েরকৃত বিভাগীয় মামলা নং ০১/২০২৬ এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) এবং ৩(ঘ) অনুসারে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।’

‘আনিত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হলো এবং তাকে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হলো। তার বরখাস্তকালীন সময়কে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করা হবে।’

এমন নাটকীয় অবস্থান ও পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। দুই প্রজ্ঞাপনে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানের কারণে প্রশ্ন উঠেছে তদন্তপ্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত স্বল্প সময়ে একটি গুরুতর অভিযোগের চিত্র এভাবে বদলে যাওয়া শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলো, সেই প্রতিবেদন কি এতটাই দুর্বল ছিল যে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য হয়ে গেল? বিশেষ করে প্রথম প্রজ্ঞাপনে ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা’ উল্লেখ করার পর দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে ‘অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি’ বলা—দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে।

ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে অভিযুক্ত কর্মকর্তার করা আবেদনে। বরখাস্তের পর তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে অভিযোগগুলো পুনঃতদন্তের দাবি জানান। তাতে নিজের নির্দোষের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার সেই আবেদনের ১৩ দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তদন্তপ্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ছিল?

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, একটি বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণ বা অপ্রমাণের বিষয়টি সাধারণত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। সেখানে এত স্বল্প সময়ে এমন নাটকীয় পরিবর্তন তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনা সুশাসন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দেয়। যদি প্রথম তদন্তে ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। আবার যদি দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত সঠিক হয়, তাহলে প্রথম প্রজ্ঞাপনের ভিত্তি কী ছিল, সেটিও ব্যাখ্যা করা জরুরি।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আবদুল্লাহ আউয়াল মজুমদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি এমন প্রতিবেদন প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিক যাচাই-বাছাই করে স্থির সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত, ১৩ দিনের মাথায় যেন তা পরিবর্তন করতে না হয়। বর্তমান সময়ে কানকথায় এসব তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে, যা কাম্য নয়।’ তবে এটা ম্যানেজ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চলমান ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ শীর্ষক প্রকল্প দুটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। এর মধ্যে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, আর এই অভিযোগ মূলত প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। অনিয়মের বিষয়টি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন প্রকল্প এলাকায় খোঁজ নিয়ে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে একটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত বছরের ৮ জুলাই। ‘নজিরবিহীন অনিয়মের নজির জনস্বাস্থ্যের প্রকল্পে’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিন, পাবলিক টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশনে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে বেশির ভাগ অবকাঠামো আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, কিছু ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত তালিকায় চলে গেছে। পানি সরবরাহের পাইপলাইন নকশাবহির্ভূতভাবে স্থাপন করা হয়েছে, ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই জলাশয় ভরাট করে কাজ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঠিকাদারদের বিল যথাযথ যাচাই ছাড়াই পরিশোধ, কাজের মান তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্তদের নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পটি নজিরবিহীন অনিয়মের উদাহরণে পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয়ের বড় উদাহরণে পরিণত হয়েছে বলে আইএমইডির মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই শুরু হওয়ায় বাস্তবায়নকালেই এটি ব্যর্থতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির মুখে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ অসম্পন্ন বা নিম্নমানের। চলমান অবস্থাতেই বহু স্থাপনা পরিত্যক্ত, টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশন নষ্ট এবং ব্যবস্থাপনায় বড় দুর্বলতা দেখা গেছে। অনেক জেলায় টয়লেটের টাইলস ও ফিটিংস ভেঙে গেছে, দরিদ্রদের জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিনে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেট দূরবর্তী ও অনুপযোগী স্থানে নির্মাণ করায় ব্যবহার হচ্ছে না। অডিটে একাধিক আপত্তি উঠলেও তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ছোট পানির স্কিম ও পাবলিক টয়লেটের নির্মাণে ব্যাপক ত্রুটি রয়েছে। অনেক স্থানে ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে গেছে, টয়লেটের মেঝে দেবে গেছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় বহু টয়লেট অচল হয়ে আছে। প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটের র্যাম্প ও প্রবেশপথ যথাযথ না হওয়ায় ব্যবহার অনুপযোগী।

হাত ধোয়ার স্টেশনগুলোর বেশির ভাগই অকেজো বা পরিত্যক্ত, কিছু আবার চুরি ও নষ্ট হয়েছে। পাইপলাইন স্থাপনেও নকশা মানা হয়নি এবং পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই কাজ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্নমানের উপকরণ ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এসব স্থাপনা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, যা সরকারি অর্থের বড় অপচয়। সবশেষে অনিয়মের জন্য দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, প্রকল্পটির কাজের গুণগত মান নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজের গুণগত মান নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা জেলা সমন্বয়কারীরা ঠিকাদারদের কাজের অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিবেদন না করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ জন্য নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি থেকে বিরত থেকেছেন সমন্বয়কারীরা।

নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয়কারীদের ঠিকাদারদের বিল যাচাইয়ের ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে যাচাই ছাড়াই বিল পরিশোধ হয়েছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, স্বয়ং প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা এ অনিয়মে সহায়তা করেছেন। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আইএমইডির প্রতিবেদনে আংশিক চিত্র এসেছে এবং সব জেলায় অনিয়ম একই মাত্রায় হয়নি। তার দাবি, তিনি কোনো অনিয়ম করেননি এবং কাউকে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিতে নিষেধও করেননি।

তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের পেছনে প্রকল্প পরিচালকেরই দায় বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক জেনেশুনেই অনিয়ম করেছেন, নিয়মকানুন মানেননি। পরিচালকই ঠিকাদারদের কাজের অনিয়ম নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি না করতে জেলা সমন্বয়কারীদের নির্দেশনা দেন। চাকরি বাঁচানোর ভয়ে প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশনা মেনে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া বন্ধ করেন তারা। মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, প্রকল্প পরিচালকের সহায়তা ছাড়া ঠিকাদারদের পক্ষে এত বড় অনিয়ম করা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম বন্ধ করার পরিবর্তে নেতিবাচক প্রতিবেদন আটকানোতেই প্রকল্প পরিচালকের বেশি মনোযোগ। অধীনস্তদের নেতিবাচক প্রতিবেদন না করার নির্দেশনা দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাতে নেতিবাচক না হয়, সে জন্য মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরির কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্নভাবে ম্যানেজ (রাজি করানো) করার চেষ্টা করেন প্রকল্প পরিচালক।

এমনকি তার অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্যও বিভিন্ন মাধ্যমে এই প্রতিবেদককেও অনুরোধ করেন প্রকল্প পরিচালক।

‘পার্টটাইম জব’ অফারে খোয়া গেল লাখ লাখ টাকা
রাজধানীর কলাবাগান এলাকার গৃহিণী নিগার সাবিহা (ছদ্মনাম)। অবসরে ফেসুবক স্ক্রল করছিলেন। নজরে এলো একটি লোভনীয় বিজ্ঞাপন—ঘরে বসে টাকা আয়ের সুযোগ। বিজ্ঞাপনদাতাদের ভাষায় যেটা ‘অনলাইনে পার্টটাইম জব’। কৌতূহল থেকে সাবিহা যোগাযোগ করলেন। জানতে পারলেন—বিনিয়োগের মাধ্যমে কয়েকটি ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করলে আসবে বিপুল অঙ্কের টাকা। লোভ সমলাতে পারলেন না সাবিহা। শুরু করেন বিনিয়োগ ও ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করা। ১৩ মার্চ থেকে শুরু; ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেন দুই লাখ আট হাজার ৮৬০ টাকা। ২৬ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই টাকা বিনিয়োগ করেন। শেষ দিকে বিনিয়োগের বিপরীতে তাকে লভ্যাংশ দেওয়া হচ্ছিল না। কোনো টাস্কও সম্পন্ন করতে বলা হচ্ছিল না। বিজ্ঞাপনদাতারা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন শুরু করেন। উপায় না পেয়ে সাবিহা দ্বারস্থ হন পুলিশের। অভিযোগ দেন কলাবাগান থানায়। রহস্য উদঘাটনে নেমে পড়ে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। রাজধানী টু মেহেরপুর নেটওয়ার্ক তদন্তে উঠে আসে, বিজ্ঞাপনদাতাদের নেটওয়ার্ক ঢাকা থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু তারা কারা, কেন এই লোভনীয় বিজ্ঞাপন এবং উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল বিজ্ঞাপনদাতারা জানেন। তাদেরকে কবজায় নিতে অভিযান শুরু করে ডিবি। ঢাকা থেকে প্রথমে গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) ধরা পড়েন দুইজন। তারা হলেন—সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন। তাদের দেওয়া তথ্যে একই দিন ঢাকা থেকে আরও পাঁচজনকে ধরা হয়। তারা হলেন—হৃদয় হাসান, মোহাম্মদ রাকিব, মো. রাশেদ, এমআই খাইরুল ও সাদিত হোসেন। জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা ডিবিকে আরও কয়েকজনের কথা জানান, যারা থাকেন মেহেরপুর। ডিবির একটি দল গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। স্থানীয় সূত্র ধরে পরদিন শুক্রবার (৮ মে) খুঁজে বের করা হয় ওই সাতজনের তিন সহযোগীকে। তারা হলেন—মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের রোহান আলী ওরফে রাকেশ, ফয়সাল আহমেদ ও সদর উপজেলার কামদেবপুর গ্রামের মো. রনি মিয়া। এই তিনজনকে ধরার পর উন্মোচন হয় মূল রহস্য। তারা ডিবির কাছে স্বীকার করেন—খণ্ডকালীন চাকরির (পার্টটাইম জব) বিজ্ঞাপন হলো তাদের প্রতারণার হাতিয়ার। তারা সংঘবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে এই প্রতারণা করে আসছিলেন। তারা মূলত ফেসবুকে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। আগ্রহীদের টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত করে ‘অনলাইন টাস্ক’ সম্পন্নের নামে ধাপে ধাপে টাকা বিনিয়োগে বাধ্য করেন। শুরুতে টাকা আয়ের লোভ দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া তাদের প্রতারণার কৌশল।  ডিবি জানায়, গত শুক্রবার মেহেরপুর থেকে রোহান ওরফে রাকেশের বাড়ি থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন, প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা নগদ ১৭ হাজার ৪৪০ টাকা ও তিনটি গ্রামীণফোনের সিম জব্দ করা হয়।  এ বিষয়ে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ডিবির একটি টিম তাদের তদন্তাধীন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করতে মেহেরপুরে অভিযান পরিচালনা করেছিল। অভিযানে মেহেরপুর জেলা পুলিশের ডিবি সদস্যরা তাদের সহযোগিতা করেছে। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটে দম্পতি ডিবি সূত্রে জানা যায়, প্রথমে ধরা পড়া সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। মিরপুর ডিওএইচএস থেকে আটক হওয়া এই দম্পতির গ্রামের বাড়ি মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপির চাঁদবিল এলাকায়। ঢাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র। তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে একই কৌশলে প্রতারণা করে আসছিলেন। চক্রটির বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া উইং জানায়, তিন ধাপে গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের কাছ থেকে প্রতারণা চক্রের আরও সদস্য, অর্থ লেনদেনের উৎস এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এজন্য গত শুক্রবার মেহেরপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত প্রত্যেকের এক দিন করে মোট তিন দিনের রিমান্ড দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির (ঢাকা দক্ষিণ) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনলাইনে পার্টটাইম চাকরি, বিনিয়োগ ও দ্রুত লাভ দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিল। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদেরকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত রিমান্ড দেন। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
‘পার্টটাইম জব’ অফারে খোয়া গেল লাখ লাখ টাকা
পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবাদ
পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারিসংক্রান্ত বিষয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। রোববার (১০ মে) পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি বিদেশ যাওয়ায় পুলিশ পদকের জিও করা সম্ভব হয়নি’ মর্মে প্রকাশিত সংবাদ সঠিক নয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ ধরনের বক্তব্য দেননি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে যে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন জারির আগে কোনো কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে অনুমাননির্ভর বক্তব্য প্রচার জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে যথাযথ তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।
পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবাদ
তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির যুগে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেবল প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করলেই চলবে না, বরং তাদের ডিজিটাল লিটারেসির (সাক্ষরতা) পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।  তিনি বলেন, তরুণদের মনোজগতে নৈতিকতার মজবুত ভিত্তি না থাকলে মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রোববার (১০ মে) রাজধানীর ড্যাফোডিল টাওয়ার মিলনায়তনে বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্ট আয়োজিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ দর্শন বাস্তবায়নে নৈতিক শিক্ষার ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ও শিক্ষাবৃত্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সমাজ ও অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটালাইজড হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত সংযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য—সবই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর। তবে দেশের অনেক কাঠামো এখনও সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তিনি বলেন, আমাদের রাষ্ট্রকে দ্রুত আধুনিক ডিজিটাল চরিত্রে রূপান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের মূল্যবোধ তৈরিতে সহায়ক কনটেন্ট প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, একজন রাষ্ট্রনায়ক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির যদি নৈতিক মানদণ্ড ঠিক না থাকে, তবে তার পরিণতি ভালো হয় না।  তিনি বলেন, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে যে পাশবিক প্রবৃত্তি থাকে, তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য শৈশব থেকেই সুকুমার বৃত্তির চর্চা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কারিকুলামে এ ধরনের নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই একটি উন্নত মনস্তত্ত্ব নিয়ে বড় হতে পারে। জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, অতীতে দেশে এমন এক দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি ছিল যেখানে ভালো কোনো উদ্যোগ বা সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরিবেশ ছিল না। বর্তমানে সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে এবং মুক্ত আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি নৈতিক সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ মাসুমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক।  অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রফেসর মো. মঈনউদ্দিন খান, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান। সেমিনার শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষাবৃত্তির চেক তুলে দেন।
তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী
চা দোকানি শেফালী হত্যার অন্তরালের রক্তাক্ত গল্প
গাজীপুরের পূবাইল থানার মেঘডুবি এলাকার ছোট্ট এক টিনশেড বাড়িতে সন্ধ্যা নামত চায়ের গন্ধে। দোকানের বেঞ্চে বসে মানুষ গল্প করত, কেউ হাসত, কেউ দিনের ক্লান্তি ভুলে এক কাপ চায়ে একটু শান্তি খুঁজত। আর সেই দোকানের মাঝখানে ব্যস্ত হাতে চা বানাতেন ৪০ পেরোনো শেফালী বেগম কুলসুম। স্বামীকে ছেড়ে, একা হাতে সংসার টেনে নেওয়া এই নারীর স্বপ্ন খুব বড় ছিল না। ছোট্ট দোকানটা চলবে, কয়েকটি ভাড়া রুমের টাকায় সন্তানদের মুখে খাবার উঠবে—এতটুকুই ছিল তার চাওয়া। কিন্তু সেই নিরীহ স্বপ্নকেও রেহাই দিল না মানুষের লোভ। ২৬ এপ্রিলের সন্ধ্যায় মেঘডুবির সেই ঘরে নেমে আসে মৃত্যু। রাত বাড়লেও দোকানের দরজা খোলেননি শেফালী। আত্মীয়রা ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা যে দৃশ্য দেখেন, তা আজও ভুলতে পারেননি কেউ। বিছানার ওপর কম্বল ঢাকা নিথর দেহ। মুখ, হাত, পেট—শরীরের প্রতিটি অংশে ধারালো অস্ত্রের নির্মম কোপ। যেন একজন মানুষকে নয়, ঘাতকরা কুপিয়েছে একজন মায়ের স্বপ্ন, এক নারীর সংগ্রাম, বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টাকে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে। স্থানীয়রা জানায়, শেফালী বেগম ছিলেন পরিশ্রমী ও দৃঢ়চেতা নারী। পারিবারিক কলহের জেরে প্রায় এক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার। এরপর তিনি মেঘডুবির কড়ইটেক এলাকায় একাই বসবাস করতেন। ছোট্ট একটি দোকান আর কয়েকটি রুম ভাড়ার আয়ে চলত সংসার। মেয়ে ময়না আক্তার স্মৃতি মাঝে মধ্যে কালীগঞ্জ থেকে এসে মাকে দেখে যেতেন। বড় ছেলে ও সাবেক স্বামী ঢাকায় খিলক্ষেতে আলাদা থাকতেন। বিচ্ছেদের পরও শেফালী নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেই একাকিত্বই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর ফাঁদে। ঘটনার দিন ২৬ এপ্রিল দুপুরে মেয়ে স্মৃতি ফোন করে মায়ের খোঁজখবর নেন। তখনও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানতে পারেন, শেফালীর বাড়ির গেট ভেতর থেকে বন্ধ, ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া মিলছে না। তারা গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখেন, ঘরের বিছানায় কম্বল ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে শেফালীর নিথর দেহ। মুখ ও শরীরজুড়ে ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। খবর পেয়ে পূবাইল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরদিন নিহতের মেয়ে ময়না আক্তার স্মৃতি বাদী হয়ে পূবাইল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরপরই পূবাইল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় ছায়া তদন্তে নামে পিবিআই গাজীপুর জেলা। তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় সোর্স ও ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণ মিলিয়ে তদন্তকারীরা দ্রুত সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করেন। অবশেষে ৮ মে দিবাগত রাতে রংপুরের গঙ্গাচড়া থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. কামরুজ্জামান (৩৫), মো. আমজাদ হোসেন (৩০) ও মো. আফজাল হোসেন (৩৩) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যার পুরো ছক। রোববার (১০ মে) পিবিআই সদর দপ্তর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই স্থানীয় একটি পলিমার কারখানার শ্রমিক। তারা প্রায়ই শেফালীর দোকান থেকে বাকিতে কেনাকাটা করতেন। পুলিশ জানায়, আসামি কামরুজ্জামানের কাছে এক হাজার ৬৪৫ টাকা, মনোয়ারের কাছে এক হাজার টাকা ও আমজাদের কাছে এক হাজার ১১৬ টাকা পাওনা ছিল। এই টাকা নিয়ে শেফালীর সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়। পিবিআই জানায়, হত্যাকারীদের ধারণা ছিল, শেফালী একা থাকেন। সুদের কারবারও আছে, ফলে তার কাছে হয়তো টাকা-স্বর্ণালংকার রয়েছে। সেই লোভ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্তরা। ঘটনার আগের দিন ২৫ এপ্রিল রাতে আসামি মনোয়ার শেফালীর দোকানে গিয়ে জানায়, পরদিন তার এক ‘গার্লফ্রেন্ড’ আসবে। কিছু সময় কাটানোর জন্য একটি রুমে জায়গা দিতে অনুরোধ করে। শেফালী সরল বিশ্বাসে রাজি হন। পরদিন দুপুরে মনোয়ার ফল, বিস্কুট, চানাচুর ও কোমল পানীয় ‘স্পিড’ নিয়ে বাসায় যায়। সঙ্গে ছিল ঘুমের ওষুধ। পরে কৌশলে পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে শেফালীকে খাওয়ানো হয় বলে জবানবন্দিতে জানায় আসামিরা। প্রায় আধাঘণ্টা পর মনোয়ার ফোন করে কামরুজ্জামানকে ভেতরে ডাকে। তখনও শেফালী ঘোরের মধ্যে ছিলেন। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, কামরুজ্জামান ঘরে ঢুকে একটি বাঁশের লাঠি দিয়ে শেফালীর মাথায় আঘাত করেন। এতে তিনি চিৎকার দিলে মনোয়ার পাশের ঘর থেকে ধারালো দা এনে খাটের ওপর উঠে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। মুখ, হাত, পেট— কোনো অংশই বাদ যায়নি। হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা ঘর তছনছ করে নগদ ৩ হাজার ২৫০ টাকা ও কিছু গহনা নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বাথরুমে হত্যায় ব্যবহৃত রক্তমাখা দা ধুয়ে রেখে যায়। ঘটনার পর আসামিরা রংপুরে নিজ এলাকায় পালিয়ে যায়। পরদিন বিকেলে তারা লুট করা গহনা বিক্রির জন্য রংপুর পুরাতন টার্মিনাল এলাকার একটি স্বর্ণের দোকানে যায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারে, গহনাগুলো আসল স্বর্ণ নয়—সেগুলো ছিল সিটিগোল্ড। এই তথ্য শুনে হতাশ হয়ে পড়ে অভিযুক্তরা। পরে গহনাগুলো নিয়ে তারা বাড়িতে ফিরে যায়। মামলা দায়েরের পর পূবাইল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও সমান্তরালে ছায়া তদন্ত চালায় পিবিআই গাজীপুর জেলা। পিবিআই প্রথমে কামরুজ্জামানকে রংপুরের গঙ্গাচড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে আমজাদ ও আফজালকেও আটক করা হয়। গ্রেপ্তারের পর কামরুজ্জামান ও আমজাদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো দা ও বাঁশের লাঠি উদ্ধার করেছে তদন্তকারী সংস্থা। পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, এই নির্মম হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় তথ্য ও পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে। এমন নৃশংস অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মেঘডুবির সেই ছোট্ট চা দোকান এখন বন্ধ। নেই শেফালীর কণ্ঠ, নেই সন্ধ্যার ব্যস্ততা। শুধু রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে তার টিনশেড ঘরটি। যে নারী জীবনভর সংগ্রাম করে সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠলেন লোভ আর নিষ্ঠুরতার শিকার।
চা দোকানি শেফালী হত্যার অন্তরালের রক্তাক্ত গল্প
পুলিশের যৌক্তিক দাবি পূরণে সরকার কাজ করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পুলিশকে একটি জনকল্যাণমুখী, আধুনিক ও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় পুলিশের যৌক্তিক দাবিসমূহ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত পুলিশ সদস্যদের জন্য অনারারি পদোন্নতির ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার ভিত্তিতে ওভারটাইম ভাতা প্রদানের বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে চিন্তাভাবনা করছে। রোববার (১০ মে) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মো. আলী হোসেন ফকির এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অনেক পুলিশ কনস্টেবল ৪০ বছর চাকরি করেও কোনো পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যান। এ বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ নীতিমালা ও সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ডের ভিত্তিতে অবসরের সময় কিছু সংখ্যক সদস্যকে অনারারি পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় কনস্টেবল থেকে অনারারি এএসআই, এএসআই থেকে অনারারি এসআই ও এসআই থেকে অনারারি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও দায়িত্বের চাপ বিবেচনায় ওভারটাইম ভাতা চালুর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইন্সপেক্টর পদ থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সদস্যদের এই সুবিধার আওতায় আনার চিন্তাভাবনা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মানসিক চাপ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালসমূহকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয়তা যাচাই সাপেক্ষে আরও উন্নত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ভবন নির্মাণ, কার্যালয় সম্প্রসারণ ও আবাসন সংকট নিরসনে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত দুই মাসে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল করতে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে অপরাধের ধরন ও মাত্রা পরিবর্তিত হয়েছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মব কালচার’ পুরোপুরি বন্ধে বিদ্যমান আইন সংশোধন ও সংযোজন করে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করা হবে। এ সময় তিনি পুলিশ সদস্যদের জনগণের প্রত্যাশা ও জনআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
পুলিশের যৌক্তিক দাবি পূরণে সরকার কাজ করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
‘পার্টটাইম জব’ অফারে খোয়া গেল লাখ লাখ টাকা
‘পার্টটাইম জব’ অফারে খোয়া গেল লাখ লাখ টাকা
রাজধানীর কলাবাগান এলাকার গৃহিণী নিগার সাবিহা (ছদ্মনাম)। অবসরে ফেসুবক স্ক্রল করছিলেন। নজরে এলো একটি লোভনীয় বিজ্ঞাপন—ঘরে বসে টাকা আয়ের সুযোগ। বিজ্ঞাপনদাতাদের ভাষায় যেটা ‘অনলাইনে পার্টটাইম জব’। কৌতূহল থেকে সাবিহা যোগাযোগ করলেন। জানতে পারলেন—বিনিয়োগের মাধ্যমে কয়েকটি ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করলে আসবে বিপুল অঙ্কের টাকা। লোভ সমলাতে পারলেন না সাবিহা। শুরু করেন বিনিয়োগ ও ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করা। ১৩ মার্চ থেকে শুরু; ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেন দুই লাখ আট হাজার ৮৬০ টাকা। ২৬ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই টাকা বিনিয়োগ করেন। শেষ দিকে বিনিয়োগের বিপরীতে তাকে লভ্যাংশ দেওয়া হচ্ছিল না। কোনো টাস্কও সম্পন্ন করতে বলা হচ্ছিল না। বিজ্ঞাপনদাতারা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন শুরু করেন। উপায় না পেয়ে সাবিহা দ্বারস্থ হন পুলিশের। অভিযোগ দেন কলাবাগান থানায়। রহস্য উদঘাটনে নেমে পড়ে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। রাজধানী টু মেহেরপুর নেটওয়ার্ক তদন্তে উঠে আসে, বিজ্ঞাপনদাতাদের নেটওয়ার্ক ঢাকা থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু তারা কারা, কেন এই লোভনীয় বিজ্ঞাপন এবং উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল বিজ্ঞাপনদাতারা জানেন। তাদেরকে কবজায় নিতে অভিযান শুরু করে ডিবি। ঢাকা থেকে প্রথমে গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) ধরা পড়েন দুইজন। তারা হলেন—সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন। তাদের দেওয়া তথ্যে একই দিন ঢাকা থেকে আরও পাঁচজনকে ধরা হয়। তারা হলেন—হৃদয় হাসান, মোহাম্মদ রাকিব, মো. রাশেদ, এমআই খাইরুল ও সাদিত হোসেন। জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা ডিবিকে আরও কয়েকজনের কথা জানান, যারা থাকেন মেহেরপুর। ডিবির একটি দল গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। স্থানীয় সূত্র ধরে পরদিন শুক্রবার (৮ মে) খুঁজে বের করা হয় ওই সাতজনের তিন সহযোগীকে। তারা হলেন—মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের রোহান আলী ওরফে রাকেশ, ফয়সাল আহমেদ ও সদর উপজেলার কামদেবপুর গ্রামের মো. রনি মিয়া। এই তিনজনকে ধরার পর উন্মোচন হয় মূল রহস্য। তারা ডিবির কাছে স্বীকার করেন—খণ্ডকালীন চাকরির (পার্টটাইম জব) বিজ্ঞাপন হলো তাদের প্রতারণার হাতিয়ার। তারা সংঘবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে এই প্রতারণা করে আসছিলেন। তারা মূলত ফেসবুকে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। আগ্রহীদের টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত করে ‘অনলাইন টাস্ক’ সম্পন্নের নামে ধাপে ধাপে টাকা বিনিয়োগে বাধ্য করেন। শুরুতে টাকা আয়ের লোভ দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া তাদের প্রতারণার কৌশল।  ডিবি জানায়, গত শুক্রবার মেহেরপুর থেকে রোহান ওরফে রাকেশের বাড়ি থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন, প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা নগদ ১৭ হাজার ৪৪০ টাকা ও তিনটি গ্রামীণফোনের সিম জব্দ করা হয়।  এ বিষয়ে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ডিবির একটি টিম তাদের তদন্তাধীন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করতে মেহেরপুরে অভিযান পরিচালনা করেছিল। অভিযানে মেহেরপুর জেলা পুলিশের ডিবি সদস্যরা তাদের সহযোগিতা করেছে। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটে দম্পতি ডিবি সূত্রে জানা যায়, প্রথমে ধরা পড়া সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। মিরপুর ডিওএইচএস থেকে আটক হওয়া এই দম্পতির গ্রামের বাড়ি মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপির চাঁদবিল এলাকায়। ঢাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র। তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে একই কৌশলে প্রতারণা করে আসছিলেন। চক্রটির বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া উইং জানায়, তিন ধাপে গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের কাছ থেকে প্রতারণা চক্রের আরও সদস্য, অর্থ লেনদেনের উৎস এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এজন্য গত শুক্রবার মেহেরপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত প্রত্যেকের এক দিন করে মোট তিন দিনের রিমান্ড দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির (ঢাকা দক্ষিণ) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনলাইনে পার্টটাইম চাকরি, বিনিয়োগ ও দ্রুত লাভ দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিল। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদেরকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত রিমান্ড দেন। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবাদ
পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবাদ
পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারিসংক্রান্ত বিষয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। রোববার (১০ মে) পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি বিদেশ যাওয়ায় পুলিশ পদকের জিও করা সম্ভব হয়নি’ মর্মে প্রকাশিত সংবাদ সঠিক নয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ ধরনের বক্তব্য দেননি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে যে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন জারির আগে কোনো কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে অনুমাননির্ভর বক্তব্য প্রচার জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে যথাযথ তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।
তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী
তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির যুগে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেবল প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করলেই চলবে না, বরং তাদের ডিজিটাল লিটারেসির (সাক্ষরতা) পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।  তিনি বলেন, তরুণদের মনোজগতে নৈতিকতার মজবুত ভিত্তি না থাকলে মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রোববার (১০ মে) রাজধানীর ড্যাফোডিল টাওয়ার মিলনায়তনে বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্ট আয়োজিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ দর্শন বাস্তবায়নে নৈতিক শিক্ষার ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ও শিক্ষাবৃত্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সমাজ ও অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটালাইজড হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত সংযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য—সবই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর। তবে দেশের অনেক কাঠামো এখনও সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তিনি বলেন, আমাদের রাষ্ট্রকে দ্রুত আধুনিক ডিজিটাল চরিত্রে রূপান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের মূল্যবোধ তৈরিতে সহায়ক কনটেন্ট প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, একজন রাষ্ট্রনায়ক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির যদি নৈতিক মানদণ্ড ঠিক না থাকে, তবে তার পরিণতি ভালো হয় না।  তিনি বলেন, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে যে পাশবিক প্রবৃত্তি থাকে, তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য শৈশব থেকেই সুকুমার বৃত্তির চর্চা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কারিকুলামে এ ধরনের নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই একটি উন্নত মনস্তত্ত্ব নিয়ে বড় হতে পারে। জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, অতীতে দেশে এমন এক দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি ছিল যেখানে ভালো কোনো উদ্যোগ বা সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরিবেশ ছিল না। বর্তমানে সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে এবং মুক্ত আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি নৈতিক সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ মাসুমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক।  অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রফেসর মো. মঈনউদ্দিন খান, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান। সেমিনার শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষাবৃত্তির চেক তুলে দেন।
চা দোকানি শেফালী হত্যার অন্তরালের রক্তাক্ত গল্প
চা দোকানি শেফালী হত্যার অন্তরালের রক্তাক্ত গল্প
গাজীপুরের পূবাইল থানার মেঘডুবি এলাকার ছোট্ট এক টিনশেড বাড়িতে সন্ধ্যা নামত চায়ের গন্ধে। দোকানের বেঞ্চে বসে মানুষ গল্প করত, কেউ হাসত, কেউ দিনের ক্লান্তি ভুলে এক কাপ চায়ে একটু শান্তি খুঁজত। আর সেই দোকানের মাঝখানে ব্যস্ত হাতে চা বানাতেন ৪০ পেরোনো শেফালী বেগম কুলসুম। স্বামীকে ছেড়ে, একা হাতে সংসার টেনে নেওয়া এই নারীর স্বপ্ন খুব বড় ছিল না। ছোট্ট দোকানটা চলবে, কয়েকটি ভাড়া রুমের টাকায় সন্তানদের মুখে খাবার উঠবে—এতটুকুই ছিল তার চাওয়া। কিন্তু সেই নিরীহ স্বপ্নকেও রেহাই দিল না মানুষের লোভ। ২৬ এপ্রিলের সন্ধ্যায় মেঘডুবির সেই ঘরে নেমে আসে মৃত্যু। রাত বাড়লেও দোকানের দরজা খোলেননি শেফালী। আত্মীয়রা ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা যে দৃশ্য দেখেন, তা আজও ভুলতে পারেননি কেউ। বিছানার ওপর কম্বল ঢাকা নিথর দেহ। মুখ, হাত, পেট—শরীরের প্রতিটি অংশে ধারালো অস্ত্রের নির্মম কোপ। যেন একজন মানুষকে নয়, ঘাতকরা কুপিয়েছে একজন মায়ের স্বপ্ন, এক নারীর সংগ্রাম, বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টাকে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে। স্থানীয়রা জানায়, শেফালী বেগম ছিলেন পরিশ্রমী ও দৃঢ়চেতা নারী। পারিবারিক কলহের জেরে প্রায় এক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার। এরপর তিনি মেঘডুবির কড়ইটেক এলাকায় একাই বসবাস করতেন। ছোট্ট একটি দোকান আর কয়েকটি রুম ভাড়ার আয়ে চলত সংসার। মেয়ে ময়না আক্তার স্মৃতি মাঝে মধ্যে কালীগঞ্জ থেকে এসে মাকে দেখে যেতেন। বড় ছেলে ও সাবেক স্বামী ঢাকায় খিলক্ষেতে আলাদা থাকতেন। বিচ্ছেদের পরও শেফালী নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেই একাকিত্বই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর ফাঁদে। ঘটনার দিন ২৬ এপ্রিল দুপুরে মেয়ে স্মৃতি ফোন করে মায়ের খোঁজখবর নেন। তখনও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানতে পারেন, শেফালীর বাড়ির গেট ভেতর থেকে বন্ধ, ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া মিলছে না। তারা গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখেন, ঘরের বিছানায় কম্বল ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে শেফালীর নিথর দেহ। মুখ ও শরীরজুড়ে ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। খবর পেয়ে পূবাইল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরদিন নিহতের মেয়ে ময়না আক্তার স্মৃতি বাদী হয়ে পূবাইল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরপরই পূবাইল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় ছায়া তদন্তে নামে পিবিআই গাজীপুর জেলা। তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় সোর্স ও ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণ মিলিয়ে তদন্তকারীরা দ্রুত সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করেন। অবশেষে ৮ মে দিবাগত রাতে রংপুরের গঙ্গাচড়া থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. কামরুজ্জামান (৩৫), মো. আমজাদ হোসেন (৩০) ও মো. আফজাল হোসেন (৩৩) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যার পুরো ছক। রোববার (১০ মে) পিবিআই সদর দপ্তর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই স্থানীয় একটি পলিমার কারখানার শ্রমিক। তারা প্রায়ই শেফালীর দোকান থেকে বাকিতে কেনাকাটা করতেন। পুলিশ জানায়, আসামি কামরুজ্জামানের কাছে এক হাজার ৬৪৫ টাকা, মনোয়ারের কাছে এক হাজার টাকা ও আমজাদের কাছে এক হাজার ১১৬ টাকা পাওনা ছিল। এই টাকা নিয়ে শেফালীর সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়। পিবিআই জানায়, হত্যাকারীদের ধারণা ছিল, শেফালী একা থাকেন। সুদের কারবারও আছে, ফলে তার কাছে হয়তো টাকা-স্বর্ণালংকার রয়েছে। সেই লোভ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্তরা। ঘটনার আগের দিন ২৫ এপ্রিল রাতে আসামি মনোয়ার শেফালীর দোকানে গিয়ে জানায়, পরদিন তার এক ‘গার্লফ্রেন্ড’ আসবে। কিছু সময় কাটানোর জন্য একটি রুমে জায়গা দিতে অনুরোধ করে। শেফালী সরল বিশ্বাসে রাজি হন। পরদিন দুপুরে মনোয়ার ফল, বিস্কুট, চানাচুর ও কোমল পানীয় ‘স্পিড’ নিয়ে বাসায় যায়। সঙ্গে ছিল ঘুমের ওষুধ। পরে কৌশলে পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে শেফালীকে খাওয়ানো হয় বলে জবানবন্দিতে জানায় আসামিরা। প্রায় আধাঘণ্টা পর মনোয়ার ফোন করে কামরুজ্জামানকে ভেতরে ডাকে। তখনও শেফালী ঘোরের মধ্যে ছিলেন। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, কামরুজ্জামান ঘরে ঢুকে একটি বাঁশের লাঠি দিয়ে শেফালীর মাথায় আঘাত করেন। এতে তিনি চিৎকার দিলে মনোয়ার পাশের ঘর থেকে ধারালো দা এনে খাটের ওপর উঠে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। মুখ, হাত, পেট— কোনো অংশই বাদ যায়নি। হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা ঘর তছনছ করে নগদ ৩ হাজার ২৫০ টাকা ও কিছু গহনা নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বাথরুমে হত্যায় ব্যবহৃত রক্তমাখা দা ধুয়ে রেখে যায়। ঘটনার পর আসামিরা রংপুরে নিজ এলাকায় পালিয়ে যায়। পরদিন বিকেলে তারা লুট করা গহনা বিক্রির জন্য রংপুর পুরাতন টার্মিনাল এলাকার একটি স্বর্ণের দোকানে যায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারে, গহনাগুলো আসল স্বর্ণ নয়—সেগুলো ছিল সিটিগোল্ড। এই তথ্য শুনে হতাশ হয়ে পড়ে অভিযুক্তরা। পরে গহনাগুলো নিয়ে তারা বাড়িতে ফিরে যায়। মামলা দায়েরের পর পূবাইল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও সমান্তরালে ছায়া তদন্ত চালায় পিবিআই গাজীপুর জেলা। পিবিআই প্রথমে কামরুজ্জামানকে রংপুরের গঙ্গাচড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে আমজাদ ও আফজালকেও আটক করা হয়। গ্রেপ্তারের পর কামরুজ্জামান ও আমজাদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো দা ও বাঁশের লাঠি উদ্ধার করেছে তদন্তকারী সংস্থা। পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, এই নির্মম হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় তথ্য ও পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে। এমন নৃশংস অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মেঘডুবির সেই ছোট্ট চা দোকান এখন বন্ধ। নেই শেফালীর কণ্ঠ, নেই সন্ধ্যার ব্যস্ততা। শুধু রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে তার টিনশেড ঘরটি। যে নারী জীবনভর সংগ্রাম করে সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠলেন লোভ আর নিষ্ঠুরতার শিকার।