একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমদ আজম খান ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন বিল, ২০২৬’ অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব তোলেন। পরে কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়। দফাওয়ারি অনুমোদনের পর বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
তবে এই বিলে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান আপত্তি তুললেও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) লিখিতভাবে স্পিকারকে জানিয়েছে, বিলটি নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
সংসদে আপত্তি জানানোর সুযোগ পেয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তবে তিনি বিলের নির্দিষ্ট কোনো ধারায় সংশোধনী প্রস্তাব তোলেননি।
তার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর স্পিকার বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল নিয়ে এনসিপির কোনো আপত্তি নেই। দলটি লিখিতভাবে অনাপত্তি দিয়েছে। সংসদের নজরে আনতেও অনুরোধ করেছে।
এরপর মন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করেন এবং অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব দেন এবং কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়। পরে সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে বিলটি পাস হয়।
এর আগে সংসদের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে এ বিলের ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা বলেছিলেন, ‘অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামের মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এই অধ্যাদেশের “বীর মুক্তিযোদ্ধা” ও মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখে।’
প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে বিএনপি সরকার আমলে আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এ অধ্যাদেশে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীর’ সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় সহযোগীদের তালিকায় তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম রাখা হয়েছিল।
অধ্যাদেশটি আইন আকারে পাস করার সুপারিশ করেছিল সংসদের বিশেষ কমিটি। ওই কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের সদস্যরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন। সংসদে শফিকুর রহমানের বক্তব্যেও সেই আপত্তির প্রতিফলন দেখা যায়।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্যের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ব্যক্তি ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষ চেয়েছিল একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা হয়েছে।
তার ভাষায়, ‘জনগণের রায় অস্বীকারের কারণেই যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীনরা সেই শিক্ষাও ধরে রাখতে পারেনি। এক পর্যায়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। এই সংসদ মাত্র সাত মিনিট আলোচনা করে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিল এবং একদলীয় বাকশালের জন্ম দিয়েছিল।’
তিনিব বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে দেশের তখনকার সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।’
‘এমনকি আওয়ামী লীগ এতটা বেপরোয়া হয়েছিল যে আওয়ামী লীগ নামে তারা নির্বাচন করে ১৯৭০ এবং ১৯৭৩ সালে ক্ষমতায় আসল, তারা স্বয়ং আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করল।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে এবং বর্তমান সংসদও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।’
বিলের মূল আপত্তির জায়গা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পরের সরকার, জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার সরকার কেউই আইনের সংজ্ঞায় রাজনৈতিক দলগুলোর নাম এভাবে আনেনি। তার ভাষায়, বিষয়টি প্রথমে শেখ হাসিনার আমলে এসেছে, পরে অন্তর্বর্তী সরকারও ‘সামান্য পরিবর্তনসহ’ সেই ধারাবাহিকতা রেখেছে।’
শফিকুর বলেন, বর্তমান উপস্থাপনায় তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম আনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ভালো জানেন, ’৭১ সালের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী, আমরা বাকিরা আংশিক সাক্ষী।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতি সুস্থ ধারায় চলুক, প্রতিটি রাজনৈতিক দল জনগণের প্রতি দায়দরদ ও দেশের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে কাজ করুক। আমরা আর এই জাতিতে কোনো বিভক্তি চাচ্ছি না।’
স্পিকার পরে বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা কার্যত নির্দিষ্ট কোনো আপত্তি তোলেননি, বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর তিনি মন্ত্রীকে বিলটি উত্থাপনের আহ্বান জানান।




